লালমনিরহাট, রংপুর,, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলাসহ উত্তরের জনপদের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর তিস্তা নদী। কৃষক, জেলে নদী তীরবর্তী গ্রামের মানুষেরা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় উজানের আগ্রাসনে ভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রতি বছর বসতভিটা ও ফসলী জমি হারিয়ে হাজারো পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিস্তা পাড়ের মানুষের অভিযোগ, মহাপরিকল্পনা ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে উত্তরের জনপদের মানুষেরা দীর্ঘদিন যাবত প্রতারণার শিকার হয়ে আসছে।তারা বলছেন, বারবার রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
তিস্তা নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা তিস্তাপাড়ের মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে আসছি। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে হাহাকার অবস্থা। আর বর্ষায় নদীভাঙনে মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এদিকে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তার দু‘পুাড়ে কর্মসংস্থানের মহাযজ্ঞ সৃষ্টি হবে এবং লাখো মানুষের বেকারত্ব লাঘব হবে। অন্যদিকে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদী ভাঙণ থেকে রক্ষা পাবে লাখ লাখ পরিবার।
তিস্তা তীরবর্তী গ্রামের সফিয়ার রহমান, শহিদুল ইসলামসহ একাধিক কৃষক জানান, শুষ্ক মওসুমে নদীতে পানির জন্য হাহাকার। অন্যদিকে বর্ষায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে নদীপাড়ের মানুষের।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভ এবং হতাশার কথা ব্যক্ত করে তারা আরো বলেন নিজস্ব অর্থায়নে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর দাবি তাদের। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রতীক্ষায় লালমনিরহাটে তিস্তা নদীতে স্থায়ী নদীশাসনের কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রতিবছর বর্ষা এলেই বাড়ছে আতঙ্ক, বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। ফলে বর্ষা মৌসুমে শঙ্কা নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে নদীপাড়ের মানুষকে। ভাঙনরোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে অস্থায়ী প্রকল্প এবং বাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
নদীপাড়ের মানুষের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা, বাঁধ মেরামত ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পানি বৃদ্ধি পেলেই অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে একই ধরনের কাজের জন্য বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকরী সুফল মিলছে না। আর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় বন্যা ও নদীভাঙনের দুর্ভোগ থেকেও মুক্তি মিলছে না লাখ লাখ মানুষের। এতে প্রতিবছর কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। হঠাৎ পানিতে কৃষকের ফসল ডুবে যায়। ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, পাট, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন সহ নানাবিধ ফসলের ক্ষতি হয়। গবাদি পশু নিয়েও চরম দুশ্চিন্তা পোহাতে হয়। সামান্য পানি এলেই প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। আর বারিঘরে পানি উঠলে গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থানে অবস্থান করতে হয়। বারিঘর ডুবে গেলে রান্না করতেও বেগ পোহাতে হয়। নানাবিধ প্রস্তুতি নিয়ে বর্ষার যুদ্ধ মোকাবিলায় প্রতিবছর চিরাচরিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
আদিতমারী এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মফিদার রহমান বলেন, ৮/১০ বার বাড়িভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিবছর নিজেকে স্বাবলম্বী গড়ে তোলবার আপ্রাণ চেষ্টা থাকলেও বর্ষায় তা আবারও ব্যর্থ হয়। বর্ষা এলেই তৈরি হয় আতঙ্ক। কখন পানি আসবে, সবকিছু ডুবে নিয়ে নিঃস্ব করে দিবে তা বলাও মুশকিল। তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বছরের পর বছর শুনলেও এখন আর আশা জাগেনা। কেননা বর্ষা আমাদের সবকিছু কেড়ে নেয়।
একই এলাকার তুহিন মিয়া বলেন, প্রতি বর্ষায় নতুন এলাকা প্লাবিত ও ভাঙ্গণে মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। শুকনো মৌসুমে কিছুটা চাষাবাদ করে ঘুরে দাঁড়ালেও আবারও নতুন বর্ষায় নিঃস্ব হয় সাধারণ মানুষ। এভাবেই চলে নদীপাড়ের মানুষের জীবন।
এরই মধ্যে ২০২২ সালে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বন্যা প্রতিরক্ষা বেরি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, বাঁধটি তিস্তার বন্যা ও ভাঙনের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের দাবি, তিস্তার পানি সামান্য বাড়লেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ বুকসমান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে বাঁধের পেছনের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ শেষ হয় না। বাঁধের কারণে ভেতরে ঢুকে পড়া পানি সহজে বের হতে না পারায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কৃষককে বিলম্বে জমিতে চাষাবাদ শুরু করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যে বাঁধ তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে স্থায়ী নদীশাসনের অভাবে নদীভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, তিস্তার পানি কমার সাথে সাথে বিভিন্ন বাম তীরে তেমন ভাঙ্গণ নাই তবে ডানতীরের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গণ রয়েছে। গত দুই অর্থবছরে আমরা বামতীরে দশ কিলোমিটার ভঙ্গপ্রবণ এলাকায় রক্ষা কাজ করেছি। তিনি আরো বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা জাতীয় ইস্যু, সরকার দ্রুত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে বলে জানান তিন। এদিকে নদীভাঙন, খরা, বন্যা ও পানিসংকটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে থাকা তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল এক বড় প্রত্যাশার নাম।
দীর্ঘ সময় যাবৎ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সমীক্ষা ও আলোচনা চললেও এখনো প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। যদিও সম্প্রতি লালমনিরহাটে সফরে এসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন, তারা মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য নয়, বরং বিভ্রান্তি ছড়াতেই এসব বক্তব্য দিচ্ছেন। তিস্তা অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাদের কখনোই দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী যেমন পদ্মা সেতুর ঘোষণা দিয়েছিলেন, তেমনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেরও ঘোষণা দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার।
সূত্রমতে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আদায় হয়নি উত্তরবঙ্গের প্রাণ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা। এক সময়ের ক্ষরস্রোতের নদীটিতে বন্যার সময় থাকে থৈথৈ পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় মরুভূমিতে। পানিবন্টন চুক্তির বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি।পানি পাওয়ার বিষয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ আশায় বুকবাধলেও সেই আশা পূরণ হয়নি। বার বার হতাশ হয়েছে ওই অঞ্চলের মানুষ।এতে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন জীবিকায়ও পরেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। বর্ষা এলেই বন্যা আর ভাঙনের মুখে পড়ে তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা।
এ যেন তিস্তার করুণ হাল, নিরাশার বালুচরে থমকে গেছে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুত দেয়া হয়েছিল ক্ষমতায় আসলে তিস্তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হবে।
তিস্তা পাড়ের মানুষের দুরবস্থা মূলত ভারতীয় বাঁধের কারণে, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানির কারণে বন্যা ও ভাঙনের ফলে সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম দুর্দশায় দিন কাটাতে হয় তাদের।
এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, তিস্তাকে আর কেবল নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে ব্যবহার না করে দ্রুত মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। কারণ, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ২ কোটি মানুষের জীবন, কৃষি ও ভবিষ্যতের সাথে জড়িয়ে থাকা এক অস্তিত্বের প্রশ্ন#


