...|...|...

লাইফস্টাইল

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের ৯ জীবন-দর্শন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১:০৮ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১:৪০
Shares
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের ৯ জীবন-দর্শন

ছবি: এআই জেনারেটেড

পৃথিবীতে সুখের সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একদিন থমকে গিয়েছিলেন এক তিব্বতি বৌদ্ধ ভিক্ষুর সামনে। নাম তার ইয়ংগে মিংগিয়ুর রিনপোছে- যাকে ঘিরে মানুষের মুখে মুখে ফেরে একটাই বিশেষণ, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ’। কৌতূহলী বিজ্ঞানীরা যখন তার মস্তিষ্ক স্ক্যান করলেন, তখন দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য চিত্র- মস্তিষ্কের বাম প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যে অংশটি আনন্দ, উৎসাহ আর ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম দেয়, সেখানে দেখা গেল অস্বাভাবিক রকম বেশি সক্রিয়তা। যেন প্রকৃতিই তার মস্তিষ্কে লিখে দিয়েছে সুখের এক ব্যতিক্রমী কোড।

৪১ বছর বয়সেও তার মস্তিষ্ক নাকি ৩৩ বছর বয়সী কারও মতো কাজ করছিল। প্রশ্ন হলো- সুখ কি শেখা সম্ভব?

তার সাক্ষাৎকার থেকে উঠে আসা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জীবন-দর্শন এখানে তুলে ধরা হলো-

১. সুবিধা কম, তৃপ্তি বেশি

আমরা এখন হাতের মুঠোয় সবকিছু পাই- আর তাই একাকীত্ব, একঘেয়েমি বা অতৃপ্তি অনুভব করলেই আমরা আইসক্রিম, স্মার্টফোন বা কফির আশ্রয় নিই।

কিন্তু রিনপোছের মতে, এই অনুভূতিগুলো আসলে একধরনের প্রজ্ঞা-এগুলো থেকে পালানোর বদলে এদের সাথে বসে থাকা, এদের বোঝার চেষ্টা করাই আসল কাজ।

যেমন, নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখতে দেখতে যদি একই সাথে ফোন স্ক্রল করতে থাকেন এবং তবুও একঘেয়েমি লাগে, বুঝবেন আরও বেশি উদ্দীপনা কখনো আসল তৃপ্তি দেবে না। বরং সব বন্ধ করে ভেতরের দিকে তাকানোর সংকেত এটি।

২. পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করুন (এমনকি ভয়ংকর পরিবর্তনকেও)

২০১১ সালে রিনপোছে এক রাতে গায়ের কাপড় ছাড়া আর কিছু না নিয়ে মঠ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন, গৃহহীন যোগীর জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে।

প্রায় তিন সপ্তাহের মাথায় খাদ্যে বিষক্রিয়ায় ভুগে দিন দিন কষ্ট সহ্য করেছিলেন- আর সেই মুহূর্তেই তিনি ‘নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া’র তিব্বতি বৌদ্ধ ধারণাটি সত্যিকার অর্থে বুঝতে শুরু করেন।

তবে এত কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গিয়েও পরিবর্তনের সাথে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব- নতুন চাকরি, নতুন সম্পর্ক, এমনকি অফিস থেকে বাড়ি ফেরার নতুন রাস্তা বা নতুন কোনো উপকরণ দিয়ে রান্না করাও ছোট ছোট সুযোগ। একঘেয়ে লাগলেই এমন একটি ছোট নতুন কিছু চেষ্টা করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

৩. শান্তির জন্য নীরবতা জরুরি নয়

রিনপোছে নিজেই স্বীকার করেন, প্রথমবার ধ্যান শিখতে গিয়ে তার ভীষণ একঘেয়ে লেগেছিল।

তার মতে ধ্যানের দুটি মূল বিষয় আছে- প্রথমত, যেকোনো পরিস্থিতিকেই ধ্যানের সহায়ক বানানো যায়; দ্বিতীয়ত, ধ্যানে কিছুটা সৃজনশীলতা থাকা দরকার, যাতে চারপাশের সবকিছুই ধ্যানের বন্ধু হয়ে ওঠে।

রাস্তার শব্দ কিংবা পাশের মানুষের ফোনের আওয়াজ-এসবকেও মনোযোগ ও প্রশান্তির উৎস বানানো সম্ভব। প্রথমে গান শুনে, তারপর জলপ্রপাত বা পাখির ডাক শুনে, এভাবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

৪. ‘তিন স্তম্ভ’ ব্যবহার করুন

তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়- দৃষ্টিভঙ্গি (view), ধ্যান (meditation) এবং প্রয়োগ (application)।

দৃষ্টিভঙ্গি বলতে বোঝায় এই বিশ্বাস যে প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই সচেতনতা, ভালোবাসা, করুণা ও প্রজ্ঞার এক ‘অভ্যন্তরীণ আকাশ’ আছে। এরপর ধ্যানচর্চা, আর তারপর সেই গুণগুলোকে দৈনন্দিন অভ্যাসে রূপান্তরিত করা।

প্রতিদিন ছোট ছোট চর্চার মাধ্যমে এটি করা যায়- কোনো একদিন পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, পরদিন সবচেয়ে বিরক্তিকর সহকর্মীর মধ্যেও ভালো কিছু খুঁজে বের করা।

৫. খুব নির্দিষ্ট বিষয়ে কৃতজ্ঞ হোন

কৃতজ্ঞতার তালিকা তৈরি করা এখন পুরনো ধারণা মনে হতে পারে, কিন্তু রিনপোছের পরামর্শ হলো সাধারণ থেকে খুব নির্দিষ্ট বিষয়ে যাওয়া- যেমন নিজের ইন্দ্রিয় থাকা, মাথার ওপর ছাদ থাকা, বা অন্তত একজন বন্ধু বা পরিবারের সদস্য থাকা নিয়ে কৃতজ্ঞ হওয়া।

প্রতিদিন একই কথা লেখার বদলে, অবসর মুহূর্তগুলোতে ছোট ছোট মুহূর্তকে উপভোগ করার চেষ্টাই এখানে মূল বিষয়- আরামদায়ক চেয়ারে বসে থাকা হোক বা সন্তানকে জঙ্গলে খেলতে দেখা।

৬. ঝড়েও আকাশ বদলায় না

ছোটবেলায় প্যানিক অ্যাটাকে ভুগতেন রিনপোছে। বাবার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন কীভাবে এর মোকাবিলা করবেন।

বাবা বলেছিলেন, ‘লড়াই কোরো না’- কারণ লড়াই করলে আতঙ্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আর দ্বিতীয়ত, আতঙ্ককে দূরে ঠেলে দেওয়ার দরকার নেই, কারণ এটি আকাশের মেঘের মতো- আসে আর চলে যায়, কিন্তু আকাশের প্রকৃতি বদলাতে পারে না। 

যত ভেতরের অস্থিরতাই হোক না কেন, মনে রাখা দরকার যে এটি মস্তিষ্কের মৌলিক কিছু বদলে দিচ্ছে না- সময়ের সাথে এটি কেটে যাবে।

চরম কষ্টের মুহূর্তে যদি এটাও কঠিন মনে হয়, তখন ঘরের তাপমাত্রা বা আশপাশের শব্দের মতো শারীরিক অনুভূতিতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

৭. স্থায়ী সুখের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস

প্রকৃত সুখ তখনই আসে যখন আমরা অতৃপ্তি বা কিছু একটা অভাবের অনুভূতি ছেড়ে দিই। শুধু সুখ খুঁজতে থাকলে উল্টো ফল হতে পারে- বেশি টাকা, নতুন দেশে যাওয়া বা নতুন চাকরি সাময়িকভাবে সুখ বাড়ালেও পরে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসি।

কিন্তু নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস, ভালোবাসা ও করুণার চর্চা করলে সময়ের সাথে সেই ভিত্তিটাই এগিয়ে নেওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিয়ে পেটের ওঠানামা বা শ্বাসের অনুভূতিতে মনোযোগ দিয়ে শুরু করা যায়, সাথে ‘আমি যেন সুখী হই এবং কষ্টমুক্ত থাকি’- জাতীয় মন্ত্র মনে মনে আবৃত্তি করে নিজের প্রতি, তারপর প্রিয়জন ও অন্য সবার প্রতি করুণা বিস্তৃত করা যায়।

৮. রাগ যেন ঘাসের ওপর হিম

সচেতনতাকে সূর্যের আলোর সাথে তুলনা করেন রিনপোছে, আর আমাদের আবেগের ধরনগুলোকে সকালের ঘাসের ওপর জমে থাকা হিমের সাথে।

সূর্যের আলো পড়লে হিম এমনিতেই গলে যায়- কোনো লড়াই ছাড়াই। যেসব ব্যবসায়িক নেতা প্রচণ্ড চাপে থাকেন এবং সবসময় রাগান্বিত বা মানসিক চাপে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাদের তিনি বলেন- শুধু রাগটাকে ধরুন, এক মুহূর্তের জন্য তার সাথে থাকুন। একবার ধরতে পারলেই একটি পছন্দ তৈরি হয়, আর তখনই সেটি বদলাতে শুরু করে।

অর্থাৎ, রাগের মুহূর্তে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের রাগটা লক্ষ্য করাই যথেষ্ট- তারপর দেখবেন সেটা নিজে থেকেই মিলিয়ে যাচ্ছে।

৯. অন্যকে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় সুখ

সত্যিকার অর্থে অন্য কাউকে সাহায্য করতে পারলে যে সুখ অনুভব হয়, তা আইসক্রিম বা কফির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা স্তরের। এটা আমরা সবাই জানি- কিন্তু কতবার সত্যিই তা করি, সেটাই প্রশ্ন। আজই হয়তো প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া যায়, যাঁর সাহায্য দরকার।

মিংগিয়ুর রিনপোছের এই নয়টি শিক্ষা মূলত একটি সাধারণ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে- সুখ কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়, বরং এটি ভেতরের একটি অভ্যাস, যা ধৈর্য ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রতিদিন ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া, নিজের অনুভূতিগুলোকে পালানোর বদলে গ্রহণ করা, এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া- এই সহজ কিন্তু গভীর অভ্যাসগুলোই ধীরে ধীরে জীবনে প্রকৃত প্রশান্তি এনে দিতে পারে।