দিনটা কেমন যাবে, তার সিদ্ধান্ত অনেকটাই হয়ে যায় ঘুম থেকে ওঠার প্রথম ৩০-৬০ মিনিটেই। আমরা প্রায়ই মনে করি দিনের খারাপ যাওয়ার কারণ অফিসের চাপ, ট্রাফিক জ্যাম বা কোনো দুর্ঘটনা।
কিন্তু ঘুম বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, সমস্যার শুরু হয় তারও অনেক আগে- বিছানা ছাড়ার মুহূর্ত থেকেই। শরীরের হরমোন ব্যবস্থা, মস্তিষ্কের সজাগ হওয়ার প্রক্রিয়া আর মানসিক অবস্থা- সবকিছুই সকালের প্রথম কয়েকটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
চলুন গবেষণাভিত্তিক তথ্যের আলোকে দেখি, কোন কোন সাধারণ সকালের অভ্যাস নিঃশব্দে আমাদের দিনটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
১. স্নুজ বাটনে বারবার চাপ দেওয়া
অ্যালার্ম বাজলেই স্নুজ চেপে আরও কয়েক মিনিট ঘুমানোর অভ্যাস আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু ঘুম বিজ্ঞান এখানে কিছুটা জটিল ছবি দেখায়।
ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক ও শরীর সম্পূর্ণ সজাগ হতে যে সময় নেয়, তাকে বলা হয় ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ বা ঘুম-জড়তা- এই সময়ে মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যায়। একইসাথে জেগে ওঠার পর শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের একটি স্বাভাবিক ঢেউ আসে, যাকে বলে ‘কর্টিসল অ্যাওয়েকেনিং রেসপন্স’ (CAR)।
বিজ্ঞান-পর্যালোচনা অনুযায়ী জাগার পরপরই কর্টিসলের মাত্রা প্রায় ৩৮-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং জাগার প্রায় ৩০ মিনিট পর তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়; এই প্রক্রিয়াটি মূলত শরীরকে জাগিয়ে তোলা ও দিনের জন্য প্রস্তুত করার কাজ করে।
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় (যা ঘুম গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত) দেখা গেছে অল্প সময়ের স্নুজিং প্রকৃতপক্ষে কর্টিসল রেসপন্স, মেজাজ কিংবা রাতের ঘুমের গঠনে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না- বরং যাদের সকালে বেশি ঝিমুনি থাকে, তাদের জন্য অল্প সময়ের স্নুজিং ঘুম-জড়তা কিছুটা কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
তবে গবেষকরা এটাও বলছেন, বারবার স্নুজ চাপলে ঘুমের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং আপনি প্রতিবার একটি নতুন ঘুম-চক্রে ঢোকেন যা কখনো সম্পূর্ণ হয় না- ফলে ক্লান্তি ও অস্পষ্টতার অনুভূতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেকে যেতে পারে। তাই মূল সমস্যাটা আসলে স্নুজ বাটন নয়, বরং তার পেছনে থাকা ঘুমের ঘাটতি ও অনিয়মিত সময়সূচি।
করণীয়: যে সময়ে আসলেই উঠতে হবে, অ্যালার্ম সেই সময়েই সেট করুন এবং বিছানা থেকে সাথে সাথে উঠে পড়ার অভ্যাস করুন। ঘুম-জড়তা এড়াতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করা।
২. চোখ খুলেই ফোন হাতে নেওয়া
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ঘুম থেকে ওঠার ১৫ মিনিটের মধ্যেই ফোন চেক করেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই অভ্যাস মস্তিষ্ককে সরাসরি প্রতিক্রিয়াশীল (reactive) অবস্থায় ঠেলে দেয়- দিন শুরুর আগেই মন ইমেইল, মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা-সমালোচনার জালে জড়িয়ে পড়ে।
এতে ভেতরের সমালোচক-কণ্ঠস্বর সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মানসিক চাপ বেড়ে যায়, এমনকি দিন শুরু হওয়ার আগেই।সাম্প্রতিক একটি জরিপেও একই প্রবণতা দেখা গেছে- উত্তরদাতাদের একাংশ জানিয়েছেন, সকালে ফোনে সময় সীমিত রাখলে তাদের দিন ভালো কাটে বলে মনে হয়েছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, ঘুম থেকে ওঠার পরপরই বেশি স্ক্রিন-সময় উদ্বেগ বাড়াতে এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমাতে পারে।
করণীয়: ঘুম থেকে ওঠার প্রথম ১৫-৩০ মিনিট ফোন স্পর্শ না করার চেষ্টা করুন। এই সময়টুকু নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীর নাড়াচাড়া বা পরিকল্পনার জন্য রাখুন।
৩. পানি না খেয়েই দিন শুরু করা
৭-৮ ঘণ্টা ঘুমের পর শরীর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। সকালে এই ঘাটতি পূরণ না করলে গাঁটে আড়ষ্টতা, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং বিপাকক্রিয়া কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেকেই পানির বদলে সরাসরি চা-কফির দিকে ঝোঁকেন, কিন্তু ক্যাফেইন পানিশূন্যতার সমাধান নয়।
করণীয়: ঘুম থেকে উঠে চা-কফির আগে অন্তত এক গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করুন।
৪. নাস্তা এড়িয়ে যাওয়া বা শুধু ভারী শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া
সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়, কিন্তু গবেষণা বলছে এতে মনোযোগ, বিপাকক্রিয়া ও শক্তির মাত্রা- সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যারা নিয়মিত নাস্তা করেন, তাদের সারাদিনের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
আবার অনেকে নাস্তায় শুধু মিষ্টি বা সাদা আটার তৈরি খাবার (যেমন পাউরুটি বা বিস্কুট জাতীয় কিছু) খান, যা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ায় কিন্তু তার প্রভাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না- ফলে কিছুক্ষণ পরই ক্লান্তি ও অস্থিরতা অনুভূত হতে পারে।
করণীয়: সহজে তৈরি করা যায় এমন প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার (ডিম, দই, ফল, ওটস) হাতের কাছে রাখুন, যাতে তাড়াহুড়াতেও পুষ্টিকর নাস্তা বাদ না পড়ে।
৫. শরীরচর্চা বা নড়াচড়া একেবারে না করা
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সকালে ব্যায়াম করেন তাদের রক্তচাপ তুলনামূলক কম থাকে, ঘুমের মান ভালো হয়, মেজাজ উন্নত থাকে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও ভালো থাকে। সকালের ব্যায়াম দীর্ঘমেয়াদে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকক্রিয়াতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
পুরো ওয়ার্কআউট করার সময় না থাকলেও সমস্যা নেই- কয়েক মিনিটের স্ট্রেচিং বা হালকা হাঁটাচলাও শরীরকে সক্রিয় করে তুলতে যথেষ্ট।
৬. তাড়াহুড়ো করে সকাল কাটানো
দেরিতে ঘুম ভাঙা বা সময়ের হিসাব না রাখার কারণে তৈরি হওয়া তাড়াহুড়ো সরাসরি মানসিক চাপ বাড়ায় এবং সারাদিনের ছোট ছোট ভুলের সম্ভাবনা তৈরি করে।
গবেষকদের মতে, স্রেফ ১৫ মিনিট আগে ঘুম থেকে ওঠা মানুষকে তাড়াহুড়ো এড়িয়ে দিন শুরু করার মতো যথেষ্ট সময় দিতে পারে।
৭. ঘুম থেকে ওঠার সময়ে অনিয়ম
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘুম থেকে ওঠাকে অনেকে সমস্যা মনে করেন না, বিশেষত ছুটির দিনে। কিন্তু শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম) নিয়মিত সময়সূচির ওপর নির্ভর করে কাজ করে।
সময়ের এই তারতম্য- যাকে গবেষকরা কখনো কখনো ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’ বলেন- ঘুমের মান, সজাগ হওয়ার প্রক্রিয়া ও দিনের শুরুর অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
করণীয়: সপ্তাহের প্রতিদিন- এমনকি ছুটির দিনেও কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
৮. সকালেই নেতিবাচক তথ্যের স্রোতে ডুবে যাওয়া
সকালে ঘুম ভাঙার পরপরই দুঃসংবাদ, বিতর্কিত আলোচনা বা মানসিক চাপ তৈরি করে এমন খবরের মধ্যে ডুবে যাওয়াও একটি সাধারণ কিন্তু ক্ষতিকর অভ্যাস।
এই সময়ে মস্তিষ্ক এমনিতেই সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে, ফলে নেতিবাচক তথ্য সহজেই সারাদিনের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে যা বলা যায়
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই প্রায় প্রতিটি অভ্যাসের মূলে একই কথা লুকিয়ে আছে- শরীর ও মস্তিষ্ককে ধীরে, নিয়ন্ত্রিতভাবে জাগার সুযোগ না দেওয়া।
একটি জরিপে দেখা গেছে, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া তিনজনের মধ্যে একজন মনে করেন সকালের রুটিনের একটি ধাপ বাদ পড়লেই পুরো দিনের ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়, আর সিংহভাগ উত্তরদাতা এটাও বলেছেন যে আগের রাতের ভালো ঘুম আর পরদিনের ভালো সকাল একে অপরের সাথে সরাসরি জড়িত।
তার মানে এই নয় যে নিখুঁত একটা ‘মর্নিং রুটিন’ থাকতেই হবে। বরং একবারে সবকিছু বদলানোর চেষ্টা না করে, একটি বা দুটি অভ্যাস দিয়ে শুরু করাই বাস্তবসম্মত- যেমন ফোন হাতে নেওয়ার আগে এক গ্লাস পানি খাওয়া, কিংবা ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট রাখা। ছোট এই পরিবর্তনগুলোই ধীরে ধীরে পুরো দিনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- সায়েন্স ডাইরেক্ট ডট কম
- অনলাইন লাইব্রেরি
- ন্যাচারপেডিক


