...|...|...

সারাদেশ

পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, একদিকে চলছে নামাজ, অন্যদিকে পূজা-অর্চনা

টাইমস টুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:২২
Shares
পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, একদিকে চলছে নামাজ, অন্যদিকে পূজা-অর্চনা

ছবি: সংগৃহীত

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান’-হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতির সেতু বন্ধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রাম। একপাশে ধ্বনিত হয় পবিত্র আজানের সুর, অন্যপাশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শঙ্খ ও উলুধ্বনি।

বুধবার (২১অক্টোবার) দুপুরে দশমী পূজায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়,দক্ষিণ পশ্চিমান্ঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী উপজেলা জীবননগরের মনোহরপুর গ্রামের বাজারের পাশে মসজিদ ১শ গজ দূরে যেতেই চোখে পড়বে পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে পরপর তিনটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির।

একদিকে চলছে নামাজ, অন্যদিকে চলছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপূজার পূজা-অর্চনা। একই স্থানে মাথা উঁচু করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মহান আল্লাহর ইবাদতগাহ জামে মসজিদ,আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে মন্দির। কোনো বিভেদ নেই, নেই কোনো মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। একই প্রাঙ্গণে যার যার ধর্ম পালন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মানুষ।

সরজমিনে আরও দেখাা গেছে, যোহরের আযান হওয়ার আগে মণ্ডপের মাইকসহ বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় এলাকার মুসল্লিরা মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দূর্গামণ্ডপে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থী নারী-পুরুষ ভক্তরা দেবীর চরণে প্রণাম করেন। মন্দির আঙিনায় ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, উলুধ্বনি ও আড়তি শেষে উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে শুরু হয় প্রসাদ বিতরণ।

সন্ধ্যার পর মণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলে এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে মুসলিম পরিবারেরও নারী-পুরুষরা সবাই একসাথে উপভোগ করেন। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে দূর থেকেও পরিবারসহ আসছেন বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীরা এমনটিই জানিয়েছেন স্হানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান,উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে বহু বছর ধরে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পরম শান্তিতে সহাবস্থান করছেন। মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষদের নামাজের সুবিধাতে ১৯৭৫ সালের দিকে মসজিদ প্রতিষ্টা করে।এর দীর্ঘ সময় পরে মসজিদের ঠিক পাশেই দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করে মন্দির। গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মনোহরপুর আদিবাসী রাধাকৃষ্ণ মন্দির। পরবর্তীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সুবিধাতে আরও দুইটা মন্দির গড়ে তোলে তারা। একপাশে যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, ঠিক অপর পাশেই চলে সনাতন ধর্মের পূজা-অর্চনা ও আরতি। এখানে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।

মনোহরপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, আমাদের এখানে কখনো কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমরা যখন নামাজ পড়ি, তখন সনাতন ধর্মের ভাইয়েরা তাদের মাইক বা বাদ্যযন্ত্র সাময়িক বন্ধ রাখেন। আবার তাদের পূজার সময়ও আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করি। আমাদের কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। ধর্ম যার যার উৎসব সবার।

মনোহরপুর আদিবাসী শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি শ্রী অর্জুন বলেন, আমাদের এই গ্রামে মুসলিম আর হিন্দু ভাইদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেভাবে মিলেমিশে থেকেছেন, আমরাও সেই ধারা বজায় রাখছি। পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির থাকলেও আমরা একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করি। নামাজের সময় আমরা মন্দিরের মাইক বা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখি।আবার আমরা ঈদ এবং পূজায় একে অপরের সাথে আনন্দ উপভোগ করি।

মনোহরপুর ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুর রশিদ জানান, হিন্দুদের যেকোনো অনুষ্ঠান উদযাপনে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি।

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সোলায়মান শেখ জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুটি সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। এ নিয়ে অধ্যবধি পর্যন্ত কোনো বিরোধের সৃষ্টি হয়নি। এটি নিঃসন্দেহে সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন এবং বাঙালি সংস্কৃতির গর্বের বিষয়।