...|...|...

লাইফস্টাইল

নারীদের এগ ফ্রিজিং কী, বাংলাদেশে কি এই সেবা আছে?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:৪৬ | আপডেট: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:৪৫
Shares
নারীদের এগ ফ্রিজিং কী, বাংলাদেশে কি এই সেবা আছে?

ছবি: সংগৃহীত

সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া, ক্যারিয়ার গড়া, উপযুক্ত সঙ্গীর অপেক্ষা কিংবা ক্যান্সারের মতো কঠিন অসুখের চিকিৎসা- এসব কারণে বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বেশি নারী এগ ফ্রিজিং বা ডিম্বাণু সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকছেন।

একসময় যেটি ছিল মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত শাখা, তা এখন পরিণত হয়েছে একটি দ্রুত বর্ধনশীল বৈশ্বিক শিল্পে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে এই সেবা চালু হয়েছে, যদিও এখানে এর ব্যবহার এখনো সীমিত।

এই লেখায় এগ ফ্রিজিংয়ের বিজ্ঞানভিত্তিক দিক, সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল, বৈশ্বিক প্রবণতা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এগ ফ্রিজিং আসলে কী

এগ ফ্রিজিং বা ওসাইট ক্রায়োপ্রিজারভেশন হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ডিম্বাশয় থেকে নিষিক্ত না হওয়া পরিপক্ব ডিম্বাণু সংগ্রহ করে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে তা ব্যবহার করে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়।

ডিম্বাণু। ছবি: সংগৃহীত

প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

  • প্রথমে হরমোন পরীক্ষা ও আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ যাচাই করা হয়।
  • এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাতে একসাথে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়ে ওঠে।
  • ডিম্বাণু প্রস্তুত হলে সেডেশনের মধ্যে রেখে আল্ট্রাসাউন্ড-নির্দেশিত সূচের সাহায্যে যোনিপথ দিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
  • সংগৃহীত ডিম্বাণু ‘ভিট্রিফিকেশন’ নামের দ্রুত হিমায়ন পদ্ধতিতে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হয়।

ভবিষ্যতে ব্যবহারের সময় ডিম্বাণু গলিয়ে শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং সেটি জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। কেউ চাইলে ডিম্বাণুর বদলে আগে থেকেই নিষিক্ত ভ্রূণও ফ্রিজ করে রাখতে পারেন, একে বলে এমব্রিও ফ্রিজিং।

কেন নারীরা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন

এগ ফ্রিজিংয়ের কারণ মূলত দুই ধরনের- চিকিৎসাজনিত এবং ব্যক্তিগত বা ‘সোশ্যাল’।

চিকিৎসাজনিত কারণ: ক্যান্সারের কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে বলে চিকিৎসা শুরুর আগে অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন। এ ছাড়া ডিম্বাশয়ে অস্ত্রোপচার বা প্রজননক্ষমতা প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোনো চিকিৎসার আগেও এটি করা হতে পারে।

সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং: পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা উপযুক্ত সঙ্গীর অভাবে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চাওয়া নারীরা কম বয়সে, যখন ডিম্বাণুর মান ভালো থাকে, তখনই তা সংরক্ষণ করে রাখেন।

সংগৃহীত ডিম্বাণু। ছবি: সংগৃহীত

বয়স বাড়ার সাথে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটোই কমতে থাকে- জন্মের সময় ডিম্বাশয়ে থাকা ১০-২০ লাখ ডিম্বাণু বয়ঃসন্ধিতে নেমে আসে তিন-পাঁচ লাখে, ৩৭ বছর বয়সে প্রায় ২৫ হাজারে এবং ৫১ বছরে মাত্র হাজারখানেকে।

বয়স ও ডিম্বাণুর সংখ্যা: সাফল্যের হার নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা

এগ ফ্রিজিংয়ের সাফল্য মূলত নির্ভর করে ডিম্বাণু সংগ্রহের সময়কার বয়স এবং সংরক্ষিত ডিম্বাণুর সংখ্যার ওপর। ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৩ হাজারের বেশি রোগীর ডেটা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যারা ৪০ বছর বয়স বা তার আগে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেছিলেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মের ঘটনা ঘটেছে।

সংগৃহীত ডিম্বাণু ফিজিং। ছবি: সংগৃহীত

৩৫ বছরের কম বয়সে ১৫-২০টি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে দেখা গেছে, আর ২০টির বেশি ডিম্বাণু সংরক্ষিত থাকলে তা আরও কিছুটা বাড়ে।

তবে বয়স বাড়ার সাথে এই সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়। ৩৮ থেকে ৪২ বছর বয়সে সংগ্রহ করা ডিম্বাণুর ক্ষেত্রে জিনগতভাবে স্বাভাবিক ভ্রূণ পাওয়ার হার নেমে আসে মাত্র ৮-৯ শতাংশে, আর ৪৩ বছরের পরে হিমায়িত ডিম্বাণু থেকে কার্যকর ভ্রূণ পাওয়া প্রায় বিরল হয়ে যায়।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন- এগ ফ্রিজিং যত কম বয়সে করা হয়, সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়েই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা নারীদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত তা ব্যবহার করতে ফিরে আসেন না। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সংরক্ষণের পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে মাত্র সামান্য অংশ নারী তাদের ডিম্বাণু ব্যবহার করেন- ঠিক যেমনটি বাংলাদেশের একটি সেন্টারেও ঘটেছে, যেখানে গত এক দশকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা কোনো নারীই এখনো তা ব্যবহার করতে ফেরেননি।

বৈশ্বিক প্রবণতা: দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত

সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক এগ ফ্রিজিং ও এমব্রিও ব্যাংকিং খাতের বাজারমূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ৫ থেকে ৫.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, এবং আগামী কয়েক বছরে এটি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে ক্যারিয়ার-কেন্দ্রিক জীবনযাপন, বিলম্বিত সন্তানধারণের প্রবণতা, নিয়োগকর্তাদের ফার্টিলিটি সুবিধা প্রদান এবং ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তির উন্নতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিম্বাণু সংগ্রহ পদ্ধতি। ছবি: সংগৃহীত 

যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এগ ফ্রিজিং চক্রের সংখ্যা ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা মোট প্রজনন চিকিৎসা ও সংরক্ষণ চক্রের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। 

জার্মানিতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সংরক্ষণকারী নারীর গড় বয়স প্রায় ৩৫ বছর এবং সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ৩০-৩৭ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে। এশিয়া অঞ্চলেও, বিশেষত চীনে, নগরায়ণ ও পরিবার-পরিকল্পনা নীতিতে পরিবর্তনের সাথে সাথে এই সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিং: সেবা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাপী এই প্রবণতার তুলনায় চিত্রটা এখনো ভিন্ন। দেশে কয়েক বছর ধরে এগ ফ্রিজিং সেবা পাওয়া গেলেও চিকিৎসাজনিত কারণ ছাড়া, অর্থাৎ সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং, এখনো তেমন জনপ্রিয় হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশের ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞরা।

মূলত ক্যান্সার আক্রান্ত নারীরাই, যাদের কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে এই সেবা নিচ্ছেন।

খরচের দিক থেকে, একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ডিম্বাণু সংগ্রহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় খরচ হয় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা বয়স ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হতে পারে।

এরপর ডিম্বাণু ফ্রিজ করার জন্য এককালীন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং বার্ষিক সংরক্ষণ ফি বাবদ প্রায় ২০ হাজার টাকা দিতে হয়, যদিও ভিন্ন ভিন্ন হাসপাতাল বা সেন্টারে বার্ষিক ফি ৩০ হাজার টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। এমব্রিও ফ্রিজিংয়ের খরচও প্রায় কাছাকাছি এবং বাংলাদেশে অনেক নারী এখন এই পদ্ধতিতেও সন্তান নিচ্ছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের একটি প্রতিষ্ঠানে গত এক দশকে মাত্র আট থেকে দশজন নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেছেন, যা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় অত্যন্ত ধীরগতির। এর ফলে বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের পর প্রকৃত সন্তান জন্মের সাফল্যের হার নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত নেই।

হরমোন ইনজেকশন গ্রহণ। ছবি: সংগৃহীত 

ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা

এগ ফ্রিজিং সাধারণভাবে নিরাপদ বিবেচিত হলেও এর কিছু ঝুঁকি রয়েছে:

  • হরমোন ইনজেকশনের কারণে ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম (ওএইচএসএস) হতে পারে, যদিও আধুনিক ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে এই ঝুঁকি এক শতাংশেরও কম।
  • ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় সংক্রমণ, রক্তপাত বা আশপাশের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সামান্য ঝুঁকি থাকে।
  • সেডেশন বা অ্যানেসথেশিয়ার কারণে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
  • হরমোনে ডিম্বাশয় যথেষ্ট সাড়া না দিলে প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ করতে হতে পারে।
  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যতে গর্ভধারণের কোনো নিশ্চয়তা নেই; এটি নির্ভর করে বয়স, ডিম্বাণুর সংখ্যা ও মানের ওপর।

দীর্ঘদিন হিমায়িত অবস্থায় রাখলে ডিম্বাণুর কার্যকারিতা কমে যায় কি না, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ডিম্বাণু, শুক্রাণু বা ভ্রূণ সর্বোচ্চ ৫৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করার সুযোগ থাকলেও প্রতি ১০ বছর পরপর নতুন করে সম্মতি দিতে হয়।

শেষ কথা

এগ ফ্রিজিং বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এটি এখনো নিশ্চিত সমাধান নয়- বরং সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি উপায় মাত্র। বয়স যত কম থাকে, সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি; তাই কেউ যদি ভবিষ্যতের জন্য এই পথ বিবেচনা করেন, তবে একজন প্রজনন বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নিজের ডিম্বাশয় রিজার্ভ, বয়স ও আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশে এই সেবা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও চাহিদা ও সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে আগামী দিনে এর ব্যবহার বাড়তে পারে বলে ধারণা করা যায়।

তথ্যসূত্র:

  • বিবিসি বাংলা;
  • হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটি (এইচএফইএ), যুক্তরাজ্য;
  • আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস; ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি জার্নাল (২০২৬ সালের সমীক্ষা); বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিবেদন (গ্লোবাল মার্কেট ইনসাইটস, দ্য বিজনেস রিসার্চ কোম্পানি)।*