রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা শুভধনপাড়ায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। অবশেষে শুভধনপাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুল পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বিদ্যালয়টির অনুমোদন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শুভধনপাড়ায় ২০২৩ সালে স্থানীয় উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এলাকার শিশুদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুভধনপাড়ায় সরকারি কোনো বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষার্থীদের কয়েক ঘণ্টা নৌপথ ও পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। অনেক পরিবারের পক্ষে নিয়মিত সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠানো সম্ভব হতো না। ফলে প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।
এমন বাস্তবতায় স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় শুভধনপাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুল। শুরুতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এবার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ায় বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় অভিভাবকেরা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি বড় আশ্রয়। পাঠদানের অনুমতি পাওয়ায় সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে।
বিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকসংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রধান শিক্ষক বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, শুভধনপাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র ও জুমচাষী পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অবশেষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিদ্যালয়টি পাঠদান অনুমোদন লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। একইসাথে বিদ্যালয়টির বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে টাইমস টুডেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে এবং পাঠদান অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিও আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি আরো বলেন,তবে পাঠদান অনুমোদন পাওয়ার পর বিদ্যালয়টির সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনুমোদনপত্রে উল্লেখিত ৪৬টি শর্তের অধিকাংশই একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র জুমচাষী পরিবারের স্থানীয় উদ্যোগে পরিচালিত বিদ্যালয়ের পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, স্থায়ী ভবন, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, সংরক্ষিত তহবিল, ICT ল্যাব, গ্রন্থাগার, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যাপক আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, এ অবস্থায় বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমরা আন্তরিক সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বিদ্যালয়টির ভৌগোলিক দুর্গমতা, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা, দরিদ্র জুমচাষী পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের শিক্ষাবঞ্চনার বাস্তবতা বিবেচনা করে বিদ্যালয়টিকে ভবিষ্যতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতীয়করণের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনা ও কার্যকর উদ্যোগ কামনা করছি। বর্তমানে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের শিক্ষাজীবন যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে, সে জন্য তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার নিশ্চয়তা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য অনেক দূরে যেতে হতো। বর্ষাকালে নৌপথ ও পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো খুবই কষ্টকর ছিল। এই বিদ্যালয়ে পাঠদানের অনুমতি পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। এখন চাই বিদ্যালয়টির উন্নয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও সহযোগিতা করুক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের দাবি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে শুভধনপাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুলটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হোক। তাদের মতে, বিদ্যালয়টি সরকারি হলে শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এতে শুভধনপাড়াসহ আশপাশের দুর্গম এলাকার আরও বেশি শিশু নিয়মিত শিক্ষার আওতায় আসতে পারবে।
স্থানীয়রা আরও বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্থানীয় উদ্যোগ ও সহযোগিতায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম টেকসই করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তাই পাঠদানের অনুমতির পাশাপাশি বিদ্যালয়টি সরকারি করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়টির অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হবে। একইসাথে বিদ্যালয়টি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
দীর্ঘদিন শিক্ষাবঞ্চিত পাহাড়ি শিশুদের জন্য শুভধনপাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুলে পাঠদানের অনুমতি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক অনুমোদন নয়; স্থানীয়দের কাছে এটি দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।


