টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও কোমর, কোথাও গলা সমান পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ভেসে গেছে ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও গবাদিপশুর খাদ্য। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক সংকট।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থা সাতকানিয়া উপজেলায়। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডলু খালের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে চলে গেছে। দুই লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বহু পরিবার কয়েকদিন ধরে রান্না করতে পারছে না। কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, আবার কেউ প্রতিবেশীর উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রান্না করছেন।
নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। বাধ্য হয়ে অনেকে দূষিত পানি ব্যবহার করছেন। এতে ডায়রিয়া, আমাশয় ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। পানিতে সাপসহ বিষাক্ত প্রাণী চলে আসায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন অনেক পরিবার।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসমতের দোকান এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান ব্রিজ এলাকায় প্রবল স্রোতে পানি ওঠায় বান্দরবানের সাথে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্গত মানুষের জন্য ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
লোহাগাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমিরাবাদ ইউনিয়ন। পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে অনেক এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। বহু মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন ১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুললেও অনেকেই এখনো বাড়িঘর ছেড়ে সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ইউএনও মো. বায়েজিদ বিন আখন্দ জানান, আমিরাবাদ থেকে ৯০ জনকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। পদুয়া ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে প্রশাসনের দল কাজ করছে।
চন্দনাইশ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। ধোপাছড়ি, বরকল ও বৈলতলী ইউনিয়নে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। প্রায় ১৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ধোপাছড়ি এলাকায় সাড়ে তিনশত মানুষ ইতোমধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
দোহাজারী এলাকায় পানি ওঠার কারণে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে কিছু সময়ের জন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে তা স্বাভাবিক হয়।
বাঁশখালীতেও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই পানির নিচে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও বানের পানি হঠাৎ করেই মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ায় প্রস্তুতির কোনো সুযোগ পাননি স্থানীয়রা। মাটির ঘর একের পর এক ভেঙে পড়েছে। ধান, চাল, আসবাবপত্র, মাছের ঘের, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য পানিতে ভেসে গেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে অনেকেই বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ হারিয়েছেন।
বাঁশখালার বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, রাতভর ঘুমাতে পারেননি। একের পর এক মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছেন। সকালে উঠে দেখেছেন চারপাশে শুধু পানি আর পানিতে ভেসে থাকা ঘরের জিনিসপত্র।
রত্নপুর গ্রামের বাসিন্দা পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় এমন বন্যা জীবনে দেখেননি। অন্যদিকে বাহারছড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মোমেন জানান, সকালে বৃষ্টি থামায় পানি কমবে ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, জলকদর খাল দখল ও ভরাট, অকার্যকর স্লুইস গেট এবং মাছের ঘেরের বাঁধের কারণে পানি নামতে পারছে না। ফলে পুরো পশ্চিম বাঁশখালী জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।


