আকাশপথের দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে এক অদ্ভুত গন্তব্যে ঠাঁই হয়েছে একটি অবসরপ্রাপ্ত এয়ারবাস এ৩০০ বিমানের। বিমানটি কোনো উড়োজাহাজের ভাঙাড়ি বা স্ক্র্যাপইয়ার্ডে না গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এজিয়ান সাগরের তলদেশে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে ২০১৬ সালে তুরস্কের কুসাদাসি উপকূলের কাছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই বিশাল আকৃতির বিমানটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
সামুদ্রিক সংরক্ষণ এবং পর্যটনের এই ব্যতিক্রমী মেলবন্ধনে ৩৬ বছরের পুরোনো একটি বাণিজ্যিক বিমানকে স্থায়ীভাবে পানির নিচের আকর্ষণে রূপান্তর করা হয়েছে। বিমানটিকে স্রেফ লোহালক্কড়ের স্তূপে পরিণত হতে না দিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এমন এক উদ্যোগ নেয়, যা সামুদ্রিক জীবন এবং অঞ্চলের পর্যটন শিল্প উভয়কেই উপকৃত করতে পারে।
‘নিওপলিস এ৩০০’ নামে পরিচিত এই বিমানটি এখন পানির প্রায় ২০ মিটার গভীরে অবস্থান করছে, যা স্কুবা ডাইভার বা ডুবুরিদের জন্য সহজেই উন্মুক্ত। কুসাদাসি ডাইভিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করতে সাবমেরিন বা পানিতে নামানোর আগেই বিমানটিকে পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয় এবং এর ভেতরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জ্বালানি লাইনসহ সমস্ত ক্ষতিকর উপকরণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অপসারণ করা হয়।
এই বিশাল ধাতব কাঠামোর ওপর সামুদ্রিক প্রাণীরা যাতে সহজেই বংশবৃদ্ধি ও বসতি গড়তে পারে, সে উদ্দেশ্যেই এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া এর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা সমুদ্রের নিচে সরাসরি একটি যাত্রীবাহী বিমান ঘুরে দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করছেন।
পানির নিচে বিমানের এক নতুন জীবন প্রায় ৫৪ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ৪৪ মিটার ডানার বিস্তারযুক্ত এই এ৩০০ বিমানটি কিনেছিল আইদিন পৌরসভা। একটি বেসরকারি এভিয়েশন কোম্পানির কাছ থেকে ২৭০,০০০ তুর্কি লিরা (সেসময়কার প্রায় ৯৫,০০০ মার্কিন ডলার) দিয়ে বিমানটি কেনা হয়। কুসাদাসিকে একটি আকর্ষণীয় ডাইভিং গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং প্রচলিত গ্রীষ্মকালীন পর্যটনের পাশাপাশি বছরজুড়ে পর্যটন অর্থনীতি সচল রাখার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এত বড় একটি বিমানকে সাগরের নিচে নামানোর পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। শত শত মানুষ নৌকা নিয়ে জড়ো হয়ে বিমানটিকে ধীরে ধীরে সাগরের বুকে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন এবং উল্লাস ও ফগহর্ন বাজিয়ে এর অবতরণকে স্বাগত জানান। পুরো অপারেশনটি শেষ হতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে এবং শেষ পর্যন্ত নাক নিচু করে বিমানটি জলের নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। এর আগে ছোটখাটো বিমান ডুবিয়ে কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর তৈরির পরীক্ষা চালালেও, এ৩০০ বিমানটি ডুবানোর মাধ্যমে ডাইভারদের জন্য আরও বড় ও আকর্ষণীয় প্রকল্পের সূচনা করে তুরস্ক।
উল্লেখ্য, ডাইভারদের সহজে ঘুরে বেড়ানোর উপযোগী করে এই বিমানটি তৈরি করা হয়েছে। কুসাদাসি ডাইভিং সেন্টার জানায়, বিমানটির দুই পাশে তিনটি করে দরজা রয়েছে, যা দিয়ে ডুবুরিরা ককপিটসহ বিমানের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। দুই তারকা বা তার চেয়ে উন্নত স্তরের ডাইভাররাই কেবল অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে এই সাইটটি পরিদর্শন করতে পারেন। ইতোমধ্যে বিমানের আশপাশে অ্যাম্বারজ্যাক, ব্ল্যাক ব্রিম, লবস্টার এবং সী র্যাবিট বা সামুদ্রিক খরগোশের মতো নানা জলজ প্রাণীর দেখা মিলছে।
অবসরপ্রাপ্ত বিমান যখন সমুদ্রের নিচের আকর্ষণ তুরস্কের এই এ৩০০ বিমান ডুবানোর ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত একটি বৃহত্তর ধারণারই অংশ, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বিমানগুলোকে সাগরের নিচে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক দ্বিতীয় জীবন দেওয়া হয়। কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীরগুলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন আশ্রয় ও তলদেশ তৈরি করে, আর বিমানের এই ধ্বংসাবশেষ সাধারণ প্রবাল প্রাচীরের বাইরে ডাইভারদের জন্য এক দারুণ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কুসাদাসির জন্য এই হিসাবটি বেশ সহজ ছিল, কারণ একটি বিশাল যাত্রীবাহী বিমান সমুদ্রের নিচে দারুণ এক দর্শনীয় স্থান তৈরির পাশাপাশি অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশেও বড় ভূমিকা রাখছে।
বাহরাইন এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে একটি বিশাল বোয়িং ৭৪৭ বিমান সাগরের নিচে ডুবিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আন্ডারওয়াটার থিম পার্ক তৈরি করেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপ্রচলিত বা অবসরে যাওয়া বাণিজ্যিক জেটগুলোকে কীভাবে সফলভাবে পর্যটনের প্রধান আকর্ষণে পরিণত করা সম্ভব।
কুসাদাসির জন্য এই প্রকল্পটি এভিয়েশনের পুরোনো ইতিহাসকে একটি সুন্দর ভবিষ্যতে রূপান্তর করার চমৎকার উপায় হয়ে এসেছে। যদিও এই এ৩০০ বিমানটি আর কোনো শহর বা দেশকে সংযুক্ত করে না, তবুও এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে মানুষকে একত্রিত করে চলেছে। এর কাঠামো এখন ডাইভারদের জন্য অন্বেষণের জায়গা, এর বহিরাংশ কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীরের অংশ এবং এর উপস্থিতি তুরস্কের সামুদ্রিক পর্যটন সম্প্রসারণের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় এক নতুন ও অনন্য অধ্যায় যোগ করেছে।


