ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বাভাবিক মোড়ে। একদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র ভারত-বিরোধী জনমত, অন্যদিকে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনীতি, নদী আর সীমান্তের বাস্তবতা- যা কোনো সরকারই পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারে না। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহু আলোচিত ভারত সফর। প্রশ্ন উঠছে- বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত এই সফর এড়িয়ে যায়, তাহলে তার মূল্য দুই দেশকে কীভাবে চোকাতে হবে? এটি কি নিছক কূটনৈতিক অহংয়ের লড়াই, নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি নতুন অধ্যায়?
শর্তের বেড়াজালে সফর
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার স্পষ্টভাবে হাঁটছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য ঢাকা তিনটি শর্ত দিল্লির কাছে স্পষ্ট করেছে- শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো, শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণ এবং সার্বিকভাবে একটি অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক দিল্লিতে প্রকাশ্য বক্তব্য এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র। ২০১৩ সালের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর থাকলেও দিল্লির ধীরগতির নীতি ঢাকাকে বারবার শীর্ষ বৈঠক পিছিয়ে দিতে বাধ্য করেছে।
তবে দিল্লির পক্ষ থেকেও ইতিবাচক ইঙ্গিত এসেছে। ভারতের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানের একটি বড় সুযোগ হতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ঢাকাকে সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত দিল্লি- এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা বাংলাদেশের। তার পরও সফরের সময়সূচি নিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় বিভ্রান্তিও দেখা গেছে; রাষ্ট্রীয় প্রটোকল প্রস্তুতি নিয়ে একদফা ঘোষণা ও প্রত্যাহারের ঘটনা সফরের অনিশ্চয়তাকেই আরও প্রকট করেছে।
অর্থনীতির অঙ্কে ঝুঁকি কতটা
আবেগের বাইরে এসে হিসাব কষলে দেখা যায়, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার। শীর্ষ বৈঠক দীর্ঘমেয়াদে এড়িয়ে চললে সবচেয়ে আগে চাপ পড়তে পারে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কেই। প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সেপা (CEPA) নিয়ে চলমান আলোচনা থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাফটার আওতায় বাংলাদেশ ভারতে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, তা পুনর্মূল্যায়িত হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধাক্কা খেতে পারে। এর চেয়েও বেশি স্পর্শকাতর নিত্যপণ্যের বাজার- পেঁয়াজ, চিনি বা গমের মতো পণ্যের সরবরাহে সামান্য টান পড়লেই তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে।
ঘনিয়ে আসছে পানির প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় সময়-সংকট অপেক্ষা করছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ১৯৯৬ সালে সইকৃত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরই। সফর যত পেছাবে, ততই কঠিন হয়ে উঠবে চুক্তি নবায়ন কিংবা তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আলোচনা- যার মাশুল সরাসরি গুনতে হবে উত্তরবঙ্গের লাখো কৃষককে। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরেও গঙ্গার পানি বণ্টন ও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল, যা প্রমাণ করে ইস্যুটি নিয়ে উভয় পক্ষই অবগত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেপাল-ভুটান থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড হয়ে বিদ্যুৎ আমদানির ট্রানজিট করিডোরের প্রশ্ন, যা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকার শঙ্কা তৈরি করছে।
জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর সরকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্যত দাঁড়িয়ে আছেন দুই বিপরীতমুখী চাপের মাঝখানে। একদিকে দেশের ভেতরে জনগণ ও বিরোধী দলগুলোর তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাব- এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দন করলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার ঝুঁকি থেকে যায়। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও বাস্তবসম্মত নয়। এই দোটানা থেকেই সরকার বেছে নিয়েছে ‘ধীরে চলো’ কৌশল- সরাসরি প্রত্যাখ্যান নয়, বরং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সময় নেওয়া। কিন্তু ভারত যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে আইনি জটিলতার আশ্রয় নিতেই থাকে, তাহলে ঢাকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে- এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
শেষ কথা: স্বার্থের রাজনীতি
কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই, থাকে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। বাংলাদেশ ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্যকে অস্বীকার করতে পারবে না, তেমনি ভারতও তার পূর্ব সীমান্তে একটি অসন্তুষ্ট প্রতিবেশী দেখতে চাইবে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, তারেক রহমান সরকার সরাসরি সম্পর্কচ্ছেদের পথে না গিয়ে পর্দার আড়ালের কূটনীতি সচল রাখবে- যার জন্য প্রয়োজন হবে ধৈর্য আর কৌশলী চাল। জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত দিল্লির কাছ থেকে নিজের দাবি আদায় করতে পারবে, নাকি এই দীর্ঘায়িত শীতলতা দুই দেশের সম্পর্ককে ঠেলে দেবে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে- তার উত্তর দেবে আগামী কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহই।

