বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৮ বছর বয়সী রাকিবুল ইসলাম। শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থেকে ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরিচিত এক তরুণের ফোন পেয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মেস থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন রাকিব।
পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, তাকে শুক্রাবাদের একটি বাসায় হত্যা করে কার্টনের ভেতরে মরদেহ ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় মো. আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪) নামে এক তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। ছেলেকে জীবিত ফেরত পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা কয়েক দফায় চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠান।
তবে টাকা দেওয়ার পরও রাকিবের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ হয়নি। একপর্যায়ে তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
জিডির সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে কাফরুল থানা পুলিশ। তদন্তে দেখা যায়, মুক্তিপণের জন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করতেন আবদুল্লাহ আল মামুন। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রাকিবকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন নীলফামারীর ডিমলায় একটি সুপারি বাগানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে কার্টনের ভেতরে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম জানান, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবের সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়েছিল। মামুন একটি মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঢাকায় আসার পর রাকিব কয়েকবার তার বাসায়ও গিয়েছিলেন। এভাবে তাদের মধ্যে পরিচয় ও বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে রাকিবকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যেতে বলা হয়। সেখান থেকে তাকে শুক্রাবাদের একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, ওই বাসায় যাওয়ার পর রাকিবের কাছে মুক্তিপণের টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এ সময় তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হলে রাকিবের ঘাড় মটকে মৃত্যু হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানিয়েছেন।
রাকিব মারা যাওয়ার পরও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা চালিয়ে যান মামুন- এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ। তিনি বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে রাকিবের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। একই সঙ্গে টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যা করা হবে বলে ভয় দেখান।
পরিবারের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পর ব্যবহৃত নম্বরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে। পরে রাকিবের কোনো সন্ধান না পেয়ে তার ভাই থানায় জিডি করেন। তদন্তের একপর্যায়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা করা হয়।
পুলিশ আরও জানায়, মরদেহ গুম করতে মামুন একটি কার্টনের ব্যবস্থা করেন। রাকিবের মরদেহ কার্টনের ভেতরে ঢুকিয়ে স্কচটেপ দিয়ে প্যাকেটটি এমনভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে বাইরে থেকে বোঝার উপায় না থাকে যে ভেতরে মরদেহ রয়েছে।
এরপর বাড়ির এক দারোয়ানের সহায়তায় কার্টনটি অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়ির এলাকায় পৌঁছান তিনি।
১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বাড়ির কাছের একটি সুপারি বাগানে গর্ত করে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডিমলা থানা পুলিশের সহযোগিতায় ওই বাগানে অভিযান চালায় পুলিশ। তার দেখানো জায়গা খুঁড়ে কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম মরদেহ শনাক্ত করেন।
মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া ৪ লাখ টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। মামুন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করায় বুধবার তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, মুক্তিপণের অর্থ কোথায় কীভাবে লেনদেন হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।


