ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ পটভূমিতে গড়ে উঠেছে চাঁদপুর জেলা। জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন জমিদারের রেখে যাওয়া প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ জনপদ। এখানকার ঐতিহাসিক বাসভবন ও রাজকীয় স্থাপনাগুলো ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীদের মনে গভীর মুগ্ধতা জাগায়। দেশের অনেক জেলার নির্দিষ্ট কিছু জমিদারবাড়ি বেশ পরিচিত হলেও চাঁদপুরের অনেক উল্লেখযোগ্য স্থাপনা এখনো পর্যটকদের নজরের বাইরে। অনেকেই ভুলবশত মনে করেন, রূপসা জমিদারবাড়ি ও ত্রিমোহনাই বুঝি এ অঞ্চলের একমাত্র দর্শনীয় স্থান। অথচ চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও অনেক ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি। এসব স্থাপনা সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রূপসা জমিদারবাড়ি
ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৫ নম্বর রূপসা উত্তর ইউনিয়নে অবস্থিত রূপসা জমিদারবাড়ি। চাঁদপুরের মানুষ কিংবা বাইরের পর্যটকদের কাছে জমিদারবাড়ি বলতে মূলত এই বাড়িটিই বেশি পরিচিত। এটি জেলার সবচেয়ে পরিচিত জমিদারবাড়ি। জনবহুল এলাকায়, একেবারে রূপসা বাজারের পাশে এর অবস্থান।
রূপসা জমিদারবাড়িটি ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আহম্মদ রাজা চৌধুরি। দেশের বেশিরভাগ জমিদারবাড়ি যখন ভগ্নদশায়, তখন চাঁদপুরের এই জমিদারবাড়িটি সংস্কার করে এখনো প্রায় আগের মতোই সুন্দর করে রাখা হয়েছে। চাঁদপুরের অন্যান্য জমিদারবাড়ির অবস্থা এটির মতো এতটা সুন্দর নয়। এ জন্যই হয়তো এই বাড়িটি সবচেয়ে পরিচিত। প্রায় ২৫০ বছর আগে বংশাল গ্রামের, বর্তমান খাজুরিয়া গ্রামের হিন্দু জমিদারদের জমিদারির পতন হলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে এই জমিদারি কিনে নেন আহম্মদ রাজা চৌধুরি এবং তিনি রূপসা জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন; যদিও এই জমিদারবাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা কে, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
এ জমিদারবাড়ির মানুষেরা মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকভাবে সাহায্য করেছিলেন। তারা প্রজাদের কখনো খাজনার জন্য চাপ দিতেন না, বরং সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকতেন। এখন এই বাড়িতে তাদের উত্তরাধিকারীরা বসবাস করেন। এখানে এখনো তিনটি ভবন, কাচারিঘর, মসজিদ, কবরস্থান ও পুকুরপাড় রয়েছে। এত সুন্দর সবকিছু সাজানো-গোছানো, দেখলে মনে হবে এখনো এখানে জমিদাররা রয়ে গেছেন আড়ালে-আবডালে।

লুধুয়া জমিদারবাড়ি
মতলব উপজেলার লুধুয়া গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ি। এর মালিক ছিলেন ছিরাপদি মিয়াজি। তিনি ১৭০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন খুব অত্যাচারী জমিদার এবং একই সাথে শৌখিন। শখের বশে অনেকগুলো ঘোড়া পুষতেন তিনি। উত্তর মতলব উপজেলার অধিকাংশ জায়গাই তার দখলে ছিল।
বর্তমানে তার বংশের উত্তরাধিকারীরা সেখানে বসবাস করেন। বাড়িটির অবস্থা প্রায় ভগ্নদশা। দুটি ভবন কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। বাকি ভবনগুলো ভেঙেচুরে নিজেদের মতো সংস্কার করে থাকছেন বাসিন্দারা। যে দুটি ভবন এখনো কোনোরকমে টিকে আছে, সেগুলোতে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার পরিবেশে বাদুড় উড়তে দেখা যায়।
বোয়ালিয়া জমিদারবাড়ি
দক্ষিণ মতলব উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। ১৭৯৩ সালে বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বাড়ির মালিক ছিলেন রায় মজুমদার ও দে চৌধুরি। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরবর্তী সময়ে মহববতপুর গ্রামের রায় মজুমদার ও বোয়ালিয়া গ্রামের দে চৌধুরি মিলে এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তারা একসাথে জমিদারি পরিচালনা করতেন।
দানশীল ও উদারমনা জমিদার হিসেবে তাদের বেশ সুনাম ছিল। মসজিদ ও মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা দান করেছিলেন তারা। এ ছাড়া একাধিক বিদ্যালয়, বাজার ও ডাকঘর প্রতিষ্ঠা করেন।
বলাখাল জমিদারবাড়ি
দ্বিতীয় দিনে আমরা গিয়েছিলাম চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল গ্রামের বলাখাল জমিদারবাড়িতে। উনিশ শতকের প্রথমদিকে এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা যোগেন্দ্র রায় নারায়ণ চৌধুরি। ১২ দশমিক ৫১ একর জমির ওপর এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে।
দানশীল জমিদার হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। বলাখাল জে এন উচ্চ বিদ্যালয় ও রেললাইনটি তাদেরই দান করা জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল। ইতিহাসে এই জমিদার বংশের তিনজন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন, জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা যোগেন্দ্র রায় নারায়ণ চৌধুরি এবং তার দুই সন্তান সুরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি ও দেবেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি।
এই জমিদারবাড়ির সামনে চারটি মূর্তি রাখা আছে। সেই মূর্তি চারটির কারুকাজ এত নিখুঁত ও সুন্দর, তা সরাসরি না দেখলে বোঝানো সম্ভব নয়।
বড়কূল জমিদারবাড়ি
এই বাড়িটি হাজীগঞ্জ উপজেলার বড়কূল গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি ভাগ্যিতা বাড়ি নামেও পরিচিত। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর আদলে বাড়িটি তৈরি করা হয়। এই বাড়িটির নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার পদ্মলোচন সাহা।
প্রায় চার একর জায়গা নিয়ে এ বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। পদ্মলোচন সাহা ছিলেন খুবই শৌখিন জমিদার। তার বাড়ির স্থাপত্যশৈলী দেখলেই তা বোঝা যায়।
লোকমুখে শোনা যায়, পুকুরে গোসল করতে গেলে জমিদারের মায়ের পায়ে কাদা লাগবে ভেবে পুকুরের তলদেশ তিনি পাকা করে দিয়েছিলেন। এখন এই জমিদারবাড়িতে জমিদার বংশের উত্তরাধিকারীরা বসবাস করেন। তারা বাড়িটিকে যত্ন করে রেখেছেন বলে বাড়িটি পরিচ্ছন্ন রয়েছে।
কড়ৈতলী জমিদারবাড়ি
ফরিদগঞ্জ উপজেলার আরও একটি জমিদারবাড়ি হচ্ছে কড়ৈতলী জমিদারবাড়ি। বাড়িটি বাবুর বাড়ি নামেই বেশি পরিচিত। বরিশাল জেলার অধিবাসী হরিশ চন্দ্র বসু বাংলা ১২২০ সালে এই কড়ৈতলী জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন করেন।
তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা জমিদারির দায়িত্ব পালন করেন। এই জমিদাররা ছিলেন অনেক অত্যাচারী। এই জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে সাধারণ মানুষ জুতা পায়ে ও ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে পারতেন না। ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে এ বাড়ির সবাই পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলায় চলে যান। ১৯৫১ সালে শেষ জমিদার গোবিন্দ বসুর হাত ধরেই এই জমিদারবাড়ির পতন ঘটে।
এ জমিদারবাড়িটিও অনেকটা জনমানবহীন এলাকায়। জমিদারবাড়ি ঘিরে এখন ভুতুড়ে পরিবেশ, অথচ একসময় তাদের কত দাপট ছিল। আগে এখানে তিনটি ভবন, দুর্গামন্দির, শানবাঁধানো ঘাটসহ বড় একটি দিঘি এবং দরবার হল ছিল। কড়ৈতলী বাজারেও তারা একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
এ বাড়িতে একটি সুড়ঙ্গপথও ছিল আত্মগোপন করার জন্য। গুপ্তধন রাখার জন্য ছিল বিশেষ ঘর, যা আঁধার মানিক হিসেবে পরিচিত। এখন পুরো বাড়ির ভগ্নদশা। দেয়ালজুড়ে শ্যাওলা আর নাম না জানা গাছের ছড়াছড়ি। ভবনের ভেতরেও জঙ্গলময় পরিবেশ।
শোল্লা জমিদারবাড়ি
ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোল্লা গ্রামে অবস্থিত শোল্লা জমিদারবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি চৌধুরি বাড়ি হিসেবে বেশি পরিচিত।
আনুমানিক ১২৮১ কিংবা ১২৯৭ বঙ্গাব্দের মধ্যে এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে কার মাধ্যমে এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও এই জমিদার বংশের কয়েকজন জমিদারের নাম পাওয়া যায় শোল্লা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওয়েবসাইট থেকে। তারা ৪৭ শতাংশ জমি দান করেছিলেন স্কুলটি নির্মাণের জন্য।
যাদের নাম পাওয়া যায়, তারা হলেন জমিদার আব্দুল ছমেদ চৌধুরি, নোয়াব আলী চৌধুরি, ইউছুফ আলী চৌধুরি, মোহাম্মদ আবদুল গফুর চৌধুরি ও মোহাম্মদ হানিফ চৌধুরি।
এ বাড়িতে এখনো মানুষ বসবাস করেন, তবে তারা জমিদারদের উত্তরাধিকারী কি না, তা জানা যায়নি। শোল্লা জমিদারবাড়িটি বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর, ভেতরের দিকটা সাদামাটা। সংস্কারের কারণে এখনো একদম নতুন লাগে দেখতে। তবে শুধু একটি ভবনই সংস্কার করা হয়েছে। বাকিগুলো সংস্কার করা হয়নি, কোনোমতে ভেঙেচুরে টিকে আছে। বাড়ির গায়ে ঝোলানো চিঠির জন্য একটি লাল রঙের টিনের বাক্স রয়েছে।
লোহাগড় জমিদারবাড়ি
ফরিদগঞ্জ উপজেলার আরও একটি জমিদারবাড়ি হচ্ছে বালিয়া ইউনিয়নের লোহাগড় গ্রামের লোহাগড় জমিদারবাড়ি। মূলত লোহাগড় মঠ দেখার জন্য বেশিরভাগ মানুষ সেখানে যান। এখানে জমিদারবাড়ি আছে, তবে সেটি ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। লোহাগড় মঠটি জমিদারবাড়ির অদূরেই।
প্রায় চার থেকে সাত শতাব্দী পুরোনো এই প্রাচীন মঠ লোহাগড় গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাশে অবস্থিত, যা লোহাগড় জমিদারবাড়ির জমিদাররা তৈরি করেছিলেন। লোহাগড় জমিদারবাড়ির দুজন জমিদারের নাম ছিল লৌহ ও গহড়। তাদের নামানুসারেই লোহাগড় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সেই জায়গা ও মঠ।
প্রায় চার থেকে সাতশ বছর আগে তারা এখানে জমিদারি করতেন। তারা খুব অত্যাচারী রাজা ছিলেন। তাদের ভয়ে কেউ রাজপ্রাসাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো প্রকার শব্দ করতেন না। এখন সেই রাজত্বের তেমন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
দুটি অনেক বড় প্রাসাদ নিয়ে ছিল লোহাগড় জমিদারবাড়ি। তাদের বাড়ির অবস্থানের নির্দেশিকাস্বরূপ সুউচ্চ মঠ নির্মাণ করা হয়। শুরুতে এখানে পাশাপাশি পাঁচটি মঠ ছিল, তবে বর্তমানে মাত্র তিনটি মঠ অবশিষ্ট রয়েছে। তাদের আর্থিক প্রতিপত্তির নিদর্শনস্বরূপ তারা মঠের শিখরে একটি স্বর্ণদণ্ড স্থাপন করেছিলেন।
কথিত আছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ওই স্বর্ণের লোভে মঠের শিখরে ওঠার অপচেষ্টায় অনেকে গুরুতর আহত হন। শুধু তা-ই নয়, কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন বলেও শোনা যায়।
পাথৈর জমিদারবাড়ি
কচুয়া সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ২ নম্বর পাথৈর ইউনিয়নের পাথৈর গ্রামে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। আনুমানিক ২০০ বছর আগে জমিদার রায়বাহাদুর শরৎচন্দ্র সেন চৌধুরি এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
এই জমিদারবাড়ির আঙিনায় দোলমন্দির, শিবমন্দির ও দুর্গামন্দির রয়েছে। সামনে রয়েছে একটি বিশাল দিঘি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জমিদার বংশের সবাই সম্পত্তি রেখে ভারতে চলে যান। বর্তমানে বাড়িটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত এবং জরাজীর্ণ অবস্থায় ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে পড়ে আছে।
সাচার জমিদারবাড়ি
কচুয়া উপজেলার বিখ্যাত বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাচার এলাকায় এটি অবস্থিত। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে তৎকালীন জমিদার গঙ্গা গোবিন্দ সেনের হাত ধরে এই জমিদারি ও বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। পরবর্তী সময়ে সুরেশ চন্দ্র চৌধুরিসহ অন্যান্য জমিদার এটি পরিচালনা করেন।
এই জমিদারবাড়ির মূল রাজকীয় ভবনটি এখনো টিকে আছে। বর্তমানে এটিতে পাথৈর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সংস্কারের অভাবে প্রাচীন এই ভবনটি এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
দারাশাহী তুলপাই জমিদারবাড়ি
চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার দারাশাহী তুলপাই গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ি। প্রায় ২৫০ বছর আগে জমিদার নুরুজ্জামান চৌধুরির হাত ধরে এই বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলের মুসলিম জমিদারি ইতিহাসের অন্যতম একটি নিদর্শন এটি।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাজকীয় বংশধরদের অনুপস্থিতিতে এটিও বর্তমানে কালের বিবর্তনে ধ্বংসের মুখে এবং অযত্নে পড়ে রয়েছে।
ভূঁইয়ারা জমিদারবাড়ি
চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলায় অবস্থিত ভূঁইয়ারা জমিদারবাড়ি, যা লোদের বাড়ি নামেও পরিচিত।
এই বাড়িটির বয়স দুইশ বছরের বেশি। এটি ঠাকুর নবীন লোদের বাবা মৃত্যুঞ্জয় লোদের আমলের। লোদের তিন ছেলে। তিন ভাইয়ের হাত ধরেই এই জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে পুরো জমিদারি পরিচালনা করতেন পূর্ণ লোদের ছেলে শরত লোদ ও নবীন লোদ।
জমিদারি প্রথা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এই বাড়িতে নবীন লোদ ও সুরেশ লোদের পরিবার থাকতেন। এই জমিদারবাড়ির দান করা জমিতে বর্তমান ভূঁইয়ারা স্কুল ছাড়াও রয়েছে প্রাচীন মনসা মন্দির। এই মন্দিরের সাথে বেহুলা-লখীন্দরের ভেলা ভেসে আসার ঘটনাও জড়িয়ে আছে। মন্দিরের জমিও দান করেছিলেন ভূঁইয়ারা জমিদার।
হরিপুর জমিদারবাড়ি
চাঁদপুর সদর উপজেলার ১২ নম্বর চান্দ্রা ইউনিয়নের হরিপুর মদনা গ্রামে অবস্থিত হরিপুর জমিদারবাড়ি। এই জমিদারবাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আলী রাজা চৌধুরি। তিনি মূলত সাত সন্তানের জনক ছিলেন। তার সন্তানদের নামানুসারে এই এস্টেটে রাজকীয় ভবনগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল।
একসময় বেশ জৌলুশপূর্ণ থাকা এই রাজবাড়িতে একতলা ও দোতলা মিলিয়ে মোট ৯টি ভবন তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি ভবনের গায়ে সাত সন্তানের নাম খোদাই করা ছিল। যেমন—মতি রাজা চৌধুরি, উমেদ রাজা চৌধুরি, কামিজ রাজা চৌধুরি ইত্যাদি।
বর্তমানে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনগুলো বেশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়ালে শ্যাওলা ও গাছপালা জন্মেছে।
সাহাপুর জমিদারবাড়ি
চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার সাহাপুর গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ি। এটি প্রাচীন মেহের পরগনার রাজধানী ছিল।
আনুমানিক ১৫ শতকের দিকে (প্রায় ৫০০ বছর আগে) রাজা শিবানন্দ খাঁ বা শিবানন্দ রায় এই রাজবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সোনারগাঁও রাজ্যের ‘দু’আনা’ অংশের মালিক ও দাশরাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। স্থানীয়ভাবে এটি অনেকের কাছে সাহাপুর চৌধুরি বাড়ি নামেও পরিচিত।
প্রাচীনকালে এটি বেশ সুরক্ষিত ও বিশাল একটি রাজকীয় দুর্গ ছিল। এখানে রাজপ্রাসাদ, রাজবাড়ির সুউচ্চ প্রাচীর, পাহারা চৌকি, ঠাকুরমন্দির, দুর্গামন্দির এবং একটি নাট্যশালা ছিল। এ ছাড়া এই রাজবাড়ির দেওয়ান সত্যরাম মজুমদার কর্তৃক ১১৯৯ সনে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন মঠও নিকটবর্তী এলাকায় রয়েছে।
কালের বিবর্তনে এখন মূল প্রাসাদের সিংহভাগ অংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত। বর্তমানে মাত্র একটি দ্বিতল ভবন, দুটি রাজকীয় প্রবেশদ্বার এবং একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ টিকে রয়েছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ
সারাদেশজুড়ে যেসব জমিদারবাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, এগুলো সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা খুবই দরকার। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিদর্শন দেখতে পাবে না, অনেক ইতিহাস তাদের অজানা থেকে যাবে।

