...|...|...

সারাদেশ

অপ্রতীমের মায়ের শঙ্কা

ঘাতকরা সংশোধনাগার থেকে বের হলে পরের টার্গেট হতে পারি আমরা

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪৬
Shares
ঘাতকরা সংশোধনাগার থেকে বের হলে পরের টার্গেট হতে পারি আমরা

নিহত অপ্রতীম ও তার পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। অপ্রতীমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের আশঙ্কা, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা কিশোর সংশোধনাগার থেকে বেরিয়ে এলে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারেন তিনি ও তার স্বামী।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে নিজের এমন আশঙ্কার কথা জানান ড. নাহিদা বেগম। এর আগেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

নাহিদা বেগমের দাবি, অপ্রতীমকে হত্যার পরিকল্পনার সাথে যারা জড়িত, তারা ভবিষ্যতে ভুক্তভোগী পরিবারের অন্য সদস্যদেরও টার্গেট করতে পারে। একইসাথে হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা কিশোর হওয়ায় আইনের সুযোগ নিয়ে সংশোধনাগার থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন তিনি। তাই অভিযুক্তদের প্রকৃত বয়সও যথাযথভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ের সানন্দ্যা এলাকায় পরিকল্পিতভাবে অপ্রতীমকে হত্যা করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। ঘটনার পর অপ্রতীমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারকে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণফোনের একটি নম্বর থেকে হুমকি আসার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর এয়ারটেলের আরেকটি নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন আসে। পরে নম্বর দুটিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। ট্রু কলারে নম্বরগুলো যথাক্রমে ‘রাসেল স্টোর’ ও ‘মোহাম্মদ আলি’ নামে সংরক্ষিত দেখা যায়।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের কারণ ও নেপথ্যের বিভিন্ন বিষয় তদন্তের আওতায় এনেছে পুলিশ। তদন্তে অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগমের মাদকবিরোধী অবস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

ড. নাহিদা বেগম বলেন, আমি স্থানীয় কোটবাড়ী সালমানপুরের মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। এ কারণে তারা আমার পরিবারকে টার্গেট করে থাকতে পারে। পাশাপাশি ঘাতকরা কিশোর হিসেবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। আমি আশঙ্কা করছি, ভবিষ্যতে তারা আমাকে এবং আমার স্বামীকে পরবর্তী টার্গেট করতে পারে।

সন্তানকে বড় করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অপ্রতীমকে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুক্ত পরিবেশে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রচলিত অর্থে তাকে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর লক্ষ্য ছিল না। বরং দেশ-বিদেশ ঘুরে পৃথিবীকে নিজের মতো করে বুঝতে শেখা এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার মতো একজন মানুষ হিসেবে তাকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

তিনি জানান, অপ্রতীমকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল। কারাতের প্রশিক্ষণও নিয়েছিল সে। এমনকি এক বছর নাচও শিখেছিল। সেই সময়ের স্মৃতি হিসেবে তার ব্যবহৃত হারমোনিয়াম এখনো বাড়িতে রয়েছে।

নাহিদা বেগম বলেন, আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলে প্রত্যেকটা কাজে সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হবে। সে মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পারত। বয়সের ব্যবধান কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র- এসব বিচার করত না।

সন্তান প্রতিপালনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আমার ভুল হতে পারে। তবে অভিভাবকদের প্রতি তার পরামর্শ, সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সে কার সাথে চলাফেরা করছে এবং কোথায় যাচ্ছে, সেসব বিষয়েও অভিভাবকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদেরও শঙ্কা কাজ করে। মাঝেমধ্যে কিছু নম্বর থেকে কল আসে, কিন্তু পরিচয় দেয় না। সেদিন কল করে গালিগালাজ করেছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ ডায়েরি করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকেও জানানো হবে।

সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিটি আশঙ্কাকে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তদন্তে ইতোমধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।

মামলাটির তদন্ত প্রথমে করছিলেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম। শুক্রবার তিনি জানান, এখন থেকে মামলাটির তদন্ত করবেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ।

নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নথি পাওয়ার পর তিনি তদন্তকাজ শুরু করবেন। তদন্ত শেষে দ্রুততম সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের আশা প্রকাশ করেন তিনি।