দূর থেকে মনে হয়, সবুজ পাহাড়ের গায়ে কে যেন সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। কাছে গেলেই দেখা যায়, চাদর নয়- হাওয়ায় দুলছে সারি সারি কাশফুল। মাথার ওপর নীল আকাশ, তার বুকজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের ঢালে সবুজের সমারোহের মধ্যে শুভ্র কাশফুলের এমন মেলবন্ধনে বদলে গেছে খাগড়াছড়ির চেনা দৃশ্যপট।
শরতের আগমনে প্রকৃতির এই নতুন সাজ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের ৮ মাইল এলাকায়। সড়কের দুই পাশে ফুটে থাকা কাশফুল পথচারীদের থামিয়ে দিচ্ছে। কেউ গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ছেন, কেউ দূর থেকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকছেন। আর যাঁরা একটু সময় নিয়ে আসছেন, তারা ঢুকে পড়ছেন কাশবনের ভেতর। হাতে মুঠোফোন, ক্যামেরার সামনে হাসিমুখ- প্রকৃতির সাথে স্মৃতি ধরে রাখার ব্যস্ততা তখন সবার।
শুধু ৮ মাইল নয়, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন প্রান্তে নদীর পাড়, জলাভূমি, পাহাড়ি গ্রামের উঁচু জমি ও সড়কের পাশে ফুটে উঠেছে কাশফুল। কোথাও সবুজ পাহাড়ের ঢালে, কোথাও জুমের জমির কিনারে, আবার কোথাও জনবসতির পাশের পতিত জমিতে শুভ্র কাশফুল জানান দিচ্ছে শরতের উপস্থিতি।
ভাদ্র-আশ্বিনের আকাশে মেঘের ভেলা আর বাতাসে কাশফুলের দোলা- বাংলার শরৎকে চেনার এ যেন চিরচেনা ছবি। বর্ষার টানা বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে যখন আসে একটু স্বস্তি, তখনই কাশফুলের সাদা শীষে চারপাশে তৈরি হয় অন্য রকম আবহ। খাগড়াছড়িতে সেই আবহ আরও আলাদা। কারণ এখানে কাশফুলের সাথে মিশে আছে পাহাড়ের সবুজ, আঁকাবাঁকা সড়ক আর নীল আকাশ।
এই সৌন্দর্য টানছে নানা বয়সী মানুষকে। শিশু-কিশোরদের কেউ কাশফুল ছুঁয়ে দেখছে, কেউ ফুল হাতে নিয়ে ছুটছে। তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত ছবি তুলতে। কেউ একা, কেউ বন্ধুদের সাথে, কেউবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ার জন্যও কাশবন হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় পটভূমি।
কাশফুলের সাথে ছবি তুলতে আসা জয়ন্তী দেওয়ান বলেন, পাহাড়ে সাধারণত এত কাশফুল একসাথে দেখা যায় না। এবার জুম পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ফুটে থাকা কাশফুল অন্য রকম সৌন্দর্য তৈরি করেছে। বন্ধুদের নিয়ে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এসেছেন তিনি। জয়ন্তীর কথায়, কাশফুলের শুভ্রতার দিকে তাকালে মনে হয়, আকাশের এক টুকরো মেঘ যেন পাহাড়ের মাটিতে নেমে এসেছে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ফারহানা আক্তারের কাছেও দৃশ্যটি মন ছুঁয়েছে। তিনি বলেন, শরৎ এলেই খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজে। এবার কাশফুলের সৌন্দর্য সেই সাজকে আরও পূর্ণ করেছে। তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই দৃশ্য দেখতে এসেছেন।
প্রকৃতিপ্রেমী ও ‘হিল অর্কিড সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাথোয়াই মারমা বলেন, শরতের কাশফুল খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি ও শুভ্র কাশফুলের মেলবন্ধন দেখতে মানুষের আগ্রহ প্রতিবছরই বাড়ছে।
তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন প্রকৃতিরই ক্ষতি না হয়। কাশবনে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, কাশফুল অকারণে নষ্ট না করা এবং আশপাশের গাছপালা ও পরিবেশের ক্ষতি না করার আহ্বান জানান তিনি।
কাশবনে মানুষের ভিড় বাড়লেও এখনো সেখানে তৈরি হয়নি পর্যটনকেন্দ্রিক কোনো স্থায়ী অবকাঠামো। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মানুষ আসছেন, সময় কাটাচ্ছেন, ছবি তুলছেন এবং ফিরে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে ছোটখাটো খাবারের দোকান বা অন্যান্য সেবার সুযোগ তৈরি হলে এই মৌসুমি আকর্ষণ ঘিরে স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে তার আগে প্রয়োজন প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো থাকতে দেওয়া। কারণ কাশফুলের সৌন্দর্য কোনো সাজানো বাগানের সৌন্দর্য নয়; এর সৌন্দর্য তার স্বাভাবিকতায়।
সন্ধ্যা নামার আগে কাশফুলের ওপর যখন শেষ বিকেলের আলো পড়ে, তখন সাদা শীষগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পাহাড়ের সবুজের মধ্যে সেই শুভ্রতা দেখে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতেই এঁকেছে এক বিশাল ছবি।
বর্ষা পেরিয়ে শরৎ এসেছে। কাশফুলের দোলায় পাহাড় বলছে সেই কথাই। খাগড়াছড়ির পথে পথে এখন তাই সাদা মেঘের মেলা। আর সেই মেলায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন দর্শনার্থী।


