প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, চায়ের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজার। যেখানে গেলে একসাথে দেখা মেলে সবুজের গালিচা মোড়ানো চা বাগান, নীল জলের বিশাল হাওর-বাঁওড়, উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলা, গহীন বন আর ২৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত রূপ-রস ঢেলে সাজিয়েছে এই জেলাকে। পর্যটনের এমন অপার সম্ভাবনা থাকার পরও শুধুমাত্র সঠিক পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে ধুঁকছে জেলার পর্যটন খাত। এতে চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকরা।
জেলা প্রশাসন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম মিলে ছোট-বড় প্রায় শতাধিক পর্যটন স্পট রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, হামহাম জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল, মাধবপুর লেকসহ অসংখ্য চা বাগান। কিন্তু জেলার ৭টি উপজেলাসহ জেলা শহরের আশপাশে পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য নেই কোনো আধুনিক ও পরিকল্পিত বিনোদন কেন্দ্র। ফলে ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন তা নিয়ে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ।
পর্যটকদের নানা সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় চিহ্নিত করে ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মহা-কর্মকৌশল ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, বেরী লেক, মনু নদের পাড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানকে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে কিছু রিসোর্ট ও পার্ক গড়ে তুললেও সরকারি উদ্যোগ বিগত ১৭ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। সব পরিকল্পনা রয়ে গেছে শুধু কাগজে-কলমে আর ফাইলে বন্দি।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ জেলা শহর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক। প্রায় ৮৮৭ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে ২০০৬ সালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বন বিভাগ এটিকে ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করে। ছোট ছোট টিলা, ঘন সবুজ বন, বাঁশবাগান আর বৈচিত্র্যময় প্রাণীকূলে সমৃদ্ধ এই পার্কটি একসময় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। পার্কের ভেতরে ছিল দৃষ্টিনন্দন কটেজ, মিনি ক্যান্টিন, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ফুট ট্রেইল ও বসার স্থান।
কিন্তু বর্তমানে সেখানে গেলে চোখে পড়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কটেজগুলোর ছাদ ভেঙে পড়েছে, ওয়াচ টাওয়ারটি ঝুঁকিপূর্ণ, ফুট ট্রেইল ঢেকে গেছে আগাছায়। ক্যান্টিনটি বহু বছর ধরে বন্ধ। সন্ধ্যা নামলেই পার্কটি পরিণত হয় ভুতুড়ে এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্কটি এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোটি টাকার এই সম্পদ এভাবে নষ্ট হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রায় ১৫ একরের ঐতিহ্যবাহী বেরী লেকের অবস্থা আরও করুণ। ব্রিটিশ আমলে খনন করা এই লেকটি একসময় ছিল শহরের ফুসফুস। লেক পাড়ে ছিল শিশু পার্ক, যেখানে শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকতো পুরো এলাকা। বিকেলে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি ছিল শহরবাসীর একমাত্র ভরসা।
কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অবৈধ দখল ও দূষণে এটি এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে। লেকের পানিতে কচুরিপানা ও প্লাস্টিকের স্তূপ। পাড়ের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। পৌরসভা থেকে বছর বছর 'সৌন্দর্যবর্ধন হবে' আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। ফলে ঐতিহ্য হারাচ্ছে শত বছরের এই লেকটি।
একইভাবে মনু নদের পাড়ে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে'র নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। নদের পাড়ে হাঁটার জন্য, বসার জন্য আধুনিক বেঞ্চ, লাইটিং সবই লাগানো হয়েছে। কিন্তু উদ্বোধনের অভাবে প্রধান ফটকে এখনো তালা ঝুলছে। সাধারণ মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন না। কোটি টাকার এই স্থাপনাটিও নষ্ট হচ্ছে অযত্নে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী রাহাত আহমেদ বলেন, আমরা মৌলভীবাজারের সন্তান হয়েও শহরে ঘোরার মতো কোনো জায়গা পাই না। ঢাকা থেকে বন্ধুরা আসলে তাদের নিয়ে কোথায় যাবো, এটা নিয়ে লজ্জায় পড়তে হয়। বর্ষিজোড়া ও বেরী লেকের মতো জায়গাগুলো ঠিক করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সুমাইয়া আক্তার বলেন, ইউটিউবে বর্ষিজোড়া ইকোপার্কের অনেক সুন্দর ভিডিও দেখে এসেছিলাম। এসে দেখি জঙ্গল ছাড়া কিছুই নেই। কোনো নিরাপত্তা নেই, বসার জায়গা নেই। টাকা আর সময় দুটোই নষ্ট হলো।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'সবুজ আন্দোলন' মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, বর্ষিজোড়াকে ঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং ও আধুনিকায়ন করতে পারলে এটি ভাওয়াল বা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের চেয়েও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারতো। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক বন, টিলা, লেক সবকিছু। শুধু সরকারের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার অভাবে এটি ধ্বংস হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, মৌলভীবাজারে পর্যটন খাত বিকশিত হলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে। হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন ব্যবসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। মৌলভীবাজার জেলা ও শহরের আশপাশে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, বেরী লেক এবং শান্তিবাগ ওয়াকওয়েকে ঘিরে একটি সমন্বিত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। প্রস্তাবটি পাশ হলেই আমরা দৃশ্যমান উন্নয়ন শুরু করবো। মৌলভীবাজারকে আমরা দেশের পর্যটনের মডেল জেলা হিসেবে গড়তে চাই।
চা-কন্যা আর হাওরের জেলা মৌলভীবাজার শুধু একটি জেলা নয়, এটি বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণ। এই প্রাণকে বাঁচাতে প্রয়োজন কাগজের পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত বাস্তবের উদ্যোগ। তা না হলে কোটি টাকার এই প্রাকৃতিক সম্পদ অচিরেই হারিয়ে যাবে দখল, দূষণ আর অবহেলার অতল গহ্বরে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের এই আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, এমনটাই প্রত্যাশা পর্যটক, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের।


