তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডেঙ্গুর আগাম বার্তা দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ে। তখন মশা নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খেতে হয় স্বাস্থ্য বিভাগকে। এবার রোগীর সংখ্যা বাড়ার আগেই সম্ভাব্য সংক্রমণের প্রবণতা শনাক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের কেরালা। ছয় বছরের রোগীর তথ্যের সাথে বৃষ্টি, তাপমাত্রা,আদ্রতা দিয়ে কেরালার ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ভাইরোলজি (আইএভি) তৈরি করেছে ডেঙ্গু আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (ডিইডব্লিউএস)। মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা প্রতি সপ্তাহে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম বার্তা দেবে।
আইএভির বিজ্ঞানী অভিন্নন্দ সি এসের তৈরি এই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় বছরের তথ্য দিয়ে। লক্ষ্য ডেঙ্গুর সংক্রমণ বড় আকার নেওয়ার আগেই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা।
ডিইডব্লিউএস কেরালার স্টেট সার্ভেইল্যান্স ইউনিটের ডেঙ্গু সংক্রান্ত তথ্যের সাথে ভারতের আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য একত্র করবে। এতে বিবেচনায় নেয়া হবে
- বৃষ্টিপাত
- তাপমাত্রা
- গড় আর্দ্রতা
- রিপোর্ট হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা
এসব তথ্য মেশিন লার্নিং মডেলে বিশ্লেষণ করে প্রতি সপ্তাহে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রবণতা সম্পর্কে পূর্বাভাস তৈরি করা হবে। এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জেলাভিত্তিক পূর্বাভাস। পুরো কেরালাকে একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি জেলাকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আবহাওয়া ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও আলাদাভাবে বিবেচনায় আসবে। পূর্বাভাসকে চারটি স্তরে ভাগ করা হবে অতি উচ্চ, উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন ঝুঁকি।
প্রাথমিক ফল যেমন হয়
আইএভির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত স্টেট সার্ভেইল্যান্স ইউনিটের তথ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে মডেলটির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। এতে পূর্বাভাস দেওয়া ডেঙ্গুর প্রবণতার সাথে বাস্তবে রিপোর্ট হওয়া রোগীর সংখ্যার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এআই প্রতিটি ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব নিখুঁতভাবে আগাম বলে দিতে পারবে। গবেষকেরাও জানিয়েছেন, ব্যবস্থাটিকে আরও পরিমার্জন করতে হবে এবং প্রতিবছর নতুন তথ্য দিয়ে হালনাগাদ করতে হবে।
আবহাওয়া দেখে ডেঙ্গুর পূর্বাভাস কেন?
ডেঙ্গু মূলত এডিস ইজিপ্টি বা এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এসব মশার বংশবিস্তার ও টিকে থাকার ওপর আবহাওয়ার প্রভাব রয়েছে। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, ড্রেন কিংবা অন্য জায়গায় জমে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা মশার বেড়ে ওঠা এবং মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সময়কে প্রভাবিত করে। আর্দ্রতাও মশার টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
তবে বৃষ্টি হলেই ডেঙ্গু রোগী বাড়বে এমন নয়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের পর মশার সংখ্যা ও ভাইরাস ছড়ানোর সক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে কিছুটা সময় লাগে। এই সময়ের ব্যবধানই কাজে লাগাতে চাইছেন গবেষকেরা।
আগাম সতর্কতা পেলে যে ব্যবস্থা নেবে স্বাস্থ্য বিভাগ
এই প্রযুক্তি সরাসরি ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করবে না। বরং কোনো এলাকায় ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে স্বাস্থ্য বিভাগকে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেবে। যেমন
- মশা নিয়ন্ত্রণ: সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে।
- পরীক্ষার প্রস্তুতি: ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য ল্যাবরেটরির প্রস্তুতি বাড়ানো সম্ভব হবে।
- হাসপাতালের প্রস্তুতি: সম্ভাব্য রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত হতে পারবে।
- সচেতনতা: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষা ও জমে থাকা পানি অপসারণের বিষয়ে আরও সতর্ক করা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জলবায়ু ও রোগের তথ্য ব্যবহার করে ডেঙ্গুর মতো জলবায়ু-নির্ভর রোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কিছু পূর্বাভাস মডেল ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রায় ১২ সপ্তাহ আগেও শনাক্ত করতে সক্ষম হতে পারে।
কেরালায় আগের গবেষণাতেও মিলেছে আবহাওয়ার প্রভাব
ডেঙ্গুর সাথে আবহাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে কেরালায় সাম্প্রতিক গবেষণাও হয়েছে। ২০২৬ সালে জিও হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় কেরালার ১৪ বছরের ডেঙ্গু ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা জুন থেকে সেপ্টেম্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টির সময়ে ঘটেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা এবং এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশনকে ডেঙ্গুর প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে এই গবেষণাগুলো কেরালার নতুন ডিইডব্লিউএস ব্যবস্থার কার্যকারিতা সরাসরি প্রমাণ করে না। বরং আবহাওয়া ও রোগের তথ্য ব্যবহার করে ডেঙ্গুর প্রবণতা অনুমানের বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সমর্থন করে।

