...|...|...

সারাদেশ

উদ্বোধনের ৪ বছরেও চালু হয়নি শিবচরের ট্রমা সেন্টার

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:৫৪
Shares
উদ্বোধনের ৪ বছরেও চালু হয়নি শিবচরের ট্রমা সেন্টার

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ব্যস্ত মহাসড়ক। পদ্মাসেতু চালুর পর ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়েতে বেড়েছে পরিবহনের চলাচল। একই সাথে বেড়েছে দূর্ঘটনাও। প্রায়ই ঘটা দূর্ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে যাত্রী-চালকসহ অনেকেরই। এদের মধ্যে সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবেই মৃত্যুর হার বেশি বলে ধারণা করা হয়।

মহাসড়কে দূর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য মহাসড়কের পাশেই মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার সন্যাসীরচর এলাকায় নির্মান করা হয় ট্রমা সেন্টার। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে তৎকালীন সরকার ট্রমা সেন্টারের সকল অবকাঠামো নির্মান কাজ শেষ করে। বিদ্যুত সংযোগ, এসি সহ আধুনিক ভাবে সজ্জিত করা হয় ট্রমাসেন্টারটি। নির্মান কাজ শেষে তৎকালীন সরকারের  স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক ট্রমা সেন্টারটি উদ্বোধন করেন। 

এরপর আর চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। বর্তমানে অরক্ষিত ট্রমা সেন্টারের সকল যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। সার্বক্ষনিক খোলা থাকে মূল গেইট এবং ভবনগুলো। মাদকসেবী, অপরাধীদের আড্ডায় ট্রমা সেন্টারটি যেন এখন ভুতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। পদ্মা সেতু সংলগ্ন এক্সপ্রেসেওয়ের (মহাসড়কের) পাশে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টারটি দীর্ঘ চার বছরেও চালু করতে না পারায় এই মহাসড়কের যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জনবল নিয়োগ কাঠামো অনুযায়ী ডাক্তার তো দূরের কথা এই পর্যন্ত একজন কর্মচারীও নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমনকি কোন পদও সৃজন করা হয়নি।

তবে এই ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টারে ৭ জন পরামর্শক চিকিৎসক, (কনসালটেন্ট), ৩ জন অর্থপেডিকসার্জন, ২ জন অ্যানেসথেটিস্ট, ২ জন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ ১৪ জন চিকিৎসক, ১০ জন নার্স, এবং ফার্মাসিষ্ট, রেডিওগ্রাফার, টেকনিশিয়ানসহ ৩৪টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। 

চালু না হওয়ায় এই চার বছরে বহুবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। চোরচক্র একটু একটু করে ভবন থেকে পানির লাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন, দরজা, জানালা, কলের মাথা, বেসিনসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুলে নিয়ে গেছে। তাছাড়া সন্ধ্যা হলেই এই ভবনের ভিতরে নেশার আড্ডা বসে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  প্রায় এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালসহ নানা জায়গায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব আর রক্ত বন্ধ করতে না পারায় রোগীদের মাঝপথেই প্রাণ দিতে হয়। তাই জনস্বার্থে দ্রুত ট্রমা সেন্টারটি চালুর দাবী এলাকাবাসী, সচেতনমহল ও এই মহাসড়কে যাতায়াতকারী দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাসানাত বলেন, ‘২০২৩ সালের ১৯ মার্চ এক্সপ্রেসওয়ের মাদারীপুর শিবচরের কুতুবপুরে যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় এক সাথে ১৯ জন মারা যান। এই দুর্ঘটনায় আহত হয় অনেকে যাত্রী। আহত যাত্রীদের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকাতে পাঠানো হয়। ঢাকা নেয়ার পথে দুই যাত্রী মারাও যায়।

তাছাড়া, চলতি মাসের গত ১২ তারিখে ট্রমা সেন্টারের কাছেই মোটরসাইকেল দূর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হলেও দ্রুত হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া এখানে প্রায় ছোট-বড় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।'

চন্দ্রা পরিবহণের সুপারভাইজার মামুন-অর-রশীদ বলেন, ‘ট্রমা সেন্টারটি খুবই জরুরি। কিন্তু এটা কেন চালু হচ্ছে না তা বোধগম্য হয়।’

স্থানীয়রা জানান, 'দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই ট্রমা সেন্টারের ভিতরে বখাটে, মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। তাছাড়া, অপরাধীরাও রাতে এখানে উৎপেতে থাকতে পারে। এই ভবনের বহু জিনিসপত্রও চুরি হয়ে গেছে। মূলত যারা নেশা করেন, তাদের টাকার প্রয়োজন হলেই এখান থেকে জিনিসপত্র খুলে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। ভবনের চারপাশও জঙ্গলে ভরে গেছে। আশেপাশের লোকজন এখন পাটখড়ি শুকায়।'

মাদারীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শরীফুল আবেদীন কমল বলেন, 'মাদারীপুর জেলার শিবচরের ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে লোকবল দরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালের জন্য পদই সৃজন হয়নি। বিগত সরকারের আমলে আমরা একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকারের কাছে আমরা আশাবাদী। আবারও প্রয়োজনীয় চাহিদা অনুযায়ী লোকবল চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'বৈদ্যুতিক লাইন, পানির লাইন, বেসিন, দরজা জানালাসহ সব কিছুই চুরি হয়ে গেছে। নিরাপত্তাকর্মী নেই তাই একাধিকবার চুরি হয়েছে। টাইলস ভাঙ্গা, ফ্লোর ভাঙ্গা, ছাদ ভাঙ্গা মোটামুটি ব্যবহারের অনুপযোগী, তাই মেরামতের প্রয়োজন। আমরা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে জানিয়েছি, তারা সরেজমিনে দেখেছেন। এটা খুব তাড়াতাড়ি বা দ্রুত কাজ করে দেয়া সম্ভব না। এটি দীর্ঘ মেয়াদী ও অনেক বড় মাপের মেরামতের কাজ করতে হবে বলে তারা জানিয়েছেন।'