ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বিগত ৭ অক্টোবরের হামলায় সমন্বয়ের যে ঘাটতি ছিল তা কাটিয়ে উঠতে এবার একই সময়ে একাধিক ফ্রন্ট থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও যৌথ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। আঞ্চলিক মিত্রদের এক সুতোয় গেঁথে এই সমন্বিত পরিকল্পনা সাজাচ্ছে তেহরান।
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার নিজস্ব শক্তির পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকের প্রো-ইরানি মিলিশিয়া বাহিনীকে একটিমাত্র একক সামরিক অভিযানে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
এর আগে, গত ৭ অক্টোবর হামাস অন্যান্য ফ্রন্টগুলোর সাথে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এবং একই সময়ে হামলার সূচনা না করেই এককভাবে আক্রমণ চালিয়েছিল। তবে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের ধারণাটি মূলত আগের থেকেই ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর গাজা উপত্যকায় উদ্ধার করা হামাসের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এই সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোকে এর মধ্যে টেনে আনতে চেয়েছিলেন।
পরিকল্পনার একটি নথিতে বহিঃস্থ ফ্রন্টগুলো অর্থাৎ লেবানন, সিরিয়া এবং সিনাইকে যুক্ত ও প্রস্তুত করার পাশাপাশি শান্তিকালীন এবং যুদ্ধকালীন যোগাযোগের প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে আগাম একমত হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
তবে যুদ্ধের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, হামলার আগে এই উচ্চাভিলাষ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় ছিল না। মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রকাশিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের পরিকল্পনার সমস্ত বিশদ বিবরণ বা সুনির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে ইরান এবং হিজবুল্লাহকে আগে থেকে জানানো হয়নি। সেই মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, সিনওয়ার বিশ্বাস করেছিলেন যে প্রাথমিক হামলার সাফল্য পরবর্তীতে হিজবুল্লাহ ও ইরানকে একটি বৃহত্তর অভিযানের দিকে টেনে আনবে। যদিও হিজবুল্লাহ উত্তরে হামলা চালিয়েছিল, তবে হামাসের হামলার দিন সকালে তারা কোনো বড় পরিসরে সমান্তরাল আক্রমণ শুরু করেনি।
ইরানের নতুন পরিকল্পনা:
আরবি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান এখন সুনির্দিষ্টভাবে সেই ব্যবধান দূর করার চেষ্টা করছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, একাধিক ফ্রন্ট যেন একই সময়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে পারে, তা নিশ্চিত করা এবং শুরু থেকেই বহু-মুখী অভিযানকে কৌশলের অংশ হিসেবে রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে হামাসের নেতৃত্বে পরিবর্তনও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গত জুলাই মাসে হামাসের সর্বাধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া খলিল আল-হায়া ইরানের সাথে সুসম্পর্কের জন্য পরিচিত এবং বহু বছর ধরে তেহরানের সাথে সংগঠনের সম্পর্ক বজায় রাখতে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। গাজাভিত্তিক এবং সিনওয়ারের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত খলিল আল-হায়া সংগঠনের অভ্যন্তরে ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতি অংশটিকে আরও শক্তিশালী করেছেন।
এছাড়া ‘রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিস’ বা প্রতিরোধ অক্ষকে পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন ফ্রন্টের মধ্যে সমন্বয় প্রক্রিয়া নবায়ন করার ইরানি প্রচেষ্টার লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ থেকে একই সাথে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আইডিএফ হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ইরানি সহায়তায় নতুন সমন্বয় চিহ্নিত করেছে। প্রকাশিত এক আইডিএফ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানি সহায়তায় হামাস ও হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়ানো শুরু করেছে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইরানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, কুদস ফোর্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে হিজবুল্লাহ, হুথি এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের কমান্ডারদের সাথে বৈঠক করেছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, আগের একটি শান্ত সময়ে কুদস ফোর্সের সিনিয়র কর্মকর্তারা তিনটি ফ্রন্টের কমান্ডারদের সাথে কনফারেন্স কলের মাধ্যমে বৈঠক করেছিলেন এবং ইরানি উপদেষ্টারাও মাঠে থেকে তাদের সাথে কাজ করেছিলেন।
একই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদন ত্বরান্বিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতাগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য ইরানের প্রচেষ্টার কথাও সামনে এসেছে। এই অক্ষের ভেতরের শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসছে। বিভিন্ন মূল্যায়নের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর ক্ষয়ক্ষতি এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের ফলে ইরাকের মিলিশিয়ারা এবং ইয়েমেনের হুথিদের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সাথে যৌথ সামরিক মহড়ার রেকর্ড তৈরি হয়েছে, অপারেশনাল ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হয়েছে এবং অক্ষের অংশীদারদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমন্বয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ৭ অক্টোবরের আগের আঞ্চলিক বাস্তবতার চেয়ে বর্তমানে এই ইরানি অক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায় কাজ করছে, যেখানে ইরাক ও ইয়েমেন আরও বেশি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।


