আইফোনের দুই দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফোল্ডিং আইফোনের মডেল উন্মোচন করে বাজি অ্যাপলের। প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহেই জন টার্নাসের নেতৃত্বে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ফোল্ডিং আইফোন। উচ্চমূল্যের এই ডিভাইসের মাধ্যমে নতুন বাজারে বড় বাজি ধরেছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) কোম্পানির বার্ষিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন এনেছেন।
বইয়ের মতো আকৃতির নতুন আইফোন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ডুও, এটি এই পণ্যের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রাথমিক মূল্য ১,৯৯৯ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২০০ ডলার । শুধু আইফোনের তো বটেই, বর্তমানে প্রচলিত ফোনগুলোর মধ্যে এটা সবচেয়ে দামী ফোন বলা যেতে পারে।
টার্নাস বলেছেন যে ডুও ‘আইপ্যাড দ্বারা অনুপ্রাণিত’ তবে এর ভাঁজ করার বৈশিষ্ট্যগুলোকে ‘সাবলীল এবং সম্পূর্ণ স্বজ্ঞামূলক’ বলে অভিহিত করেছেন।
অ্যাপলের ভেতরে ফোল্ডেবল ফোন তৈরির কাজ বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে।খোলা অবস্থায় নতুন ডুও-টিকে দেখতে একটি ছোট আইপ্যাডের মতো লাগে। অর্ধেক ভাঁজ করলে, এটিকে একটি চওড়া আইফোনের মতো দেখায়।
টার্নাস অনুষ্ঠান চলাকালীন বলেন যে, অ্যাপল বাজারে থাকা অন্যান্য ফোল্ডেবল স্মার্টফোনগুলোর চেহারা ও অনুভূতি এড়াতে চায়, যেগুলোকে তার মতে ‘দুটো ফোন একসাথে জুড়ে দেওয়ার মতো মনে হয়. যার ফলে বড় স্ক্রিনটিকে অনেক ছোট দেখায়।
তিনি বলেন, ডুও হলো ধারাবাহিক কিছু অসাধারণ উদ্ভাবনের ফল, যা আমাদের বিশ্বাস, ফোল্ডেবল ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।’
টার্নাস ফোল্ডেবল আইফোন তৈরিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন, কারণ এই বছরের শুরুতে কুকের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত হওয়ার আগে তিনি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার বিভাগে বহু বছর শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা এফডিএম সিসিএস ইনসাইট-এর প্রধান বিশ্লেষক বেন উড বলেছেন, সম্ভবত টার্নাসের পদোন্নতির সময়টি বিশেষভাবে এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘যা সম্ভবত বিগত বহু বছরের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম আইফোন উন্মোচনের সাথে মিলে যায়’।
ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিসের বিশ্লেষক ক্যারোলিনা মিলানেসি, যিনি বুধবারের উপস্থাপনায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি বলেন, টার্নাসের ওপর আলোকপাত দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনি নিজেই একটি পণ্য।
বহুদিন ধরে অ্যাপল নিয়ে সমালোচনা ছিল যে ২০০৭ সালে প্রথম আইফোনটি বাজারে আসার পর থেকে অ্যাপল এখনও পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সাফল্য বা সত্যিকারের আকর্ষণীয় উদ্ভাবন আনতে পারেনি। আইফোনের নকশা পরিবর্তন করার ফলে ওই সমালোচনার কিছুটা সমাধান হতে পারে।
ফরেস্টারের বিশ্লেষক দীপঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, ফোল্ডেবল ফোনটি পোর্টফোলিওতে একটি চড়া দামের অলঙ্কারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কেবল ব্র্যান্ডের মর্যাদা বাড়ালেও অর্থপূর্ণ প্রবৃদ্ধি আনতে নাও পারে।’
এর আগে, নতুনতম আইফোনের সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মূল্য ছিল ৯০০ ডলার (৬৬৪ পাউন্ড)। অ্যাপল বুধবার নতুন আইফোন ১৮ প্রো এবং ১৮ প্রো ম্যাক্সও উন্মোচন করেছে, যেগুলোর দাম যুক্তরাষ্ট্রে যথাক্রমে ১,১৯৯ ডলার (৮৫৫ পাউন্ড) এবং ১,২৯৯ ডলার (৯৫৯ পাউন্ড) থেকে শুরু।
মি. চ্যাটার্জি বলেছেন, ফোল্ডেবল আইফোনের পরিণতিও অ্যাপলের ভিশন প্রো হেডসেটের মতো হতে পারে, যেটির দাম কোম্পানিটি ৩,৬৯৯ ডলার (২,৭২৯ পাউন্ড) নির্ধারণ করেছিল এবং যা ক্রেতাদের কাছে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। অথবা, তিনি বলেন, এটি হতে পারে কোম্পানির পরবর্তী অ্যাপল ওয়াচ, যা আইফোনের মতো জনপ্রিয় না হলেও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ কেনেন।
আইফোনের কার্যপদ্ধতির সাথে মানুষ যেভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তা অ্যাপলের নতুন ডিজাইনের ব্যাপক বিক্রির পথে আরেকটি সম্ভাব্য বাধা।
‘ফোল্ডেবল ফোনগুলো আকর্ষণীয় ডিভাইস’ মিলানেসি উল্লেখ করেছেন। "অনেকেই এর প্রতি আগ্রহী, কিন্তু একটি প্রচলিত ফোন থেকে ফোল্ডেবল ফোনে স্থানান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার এবং শেখার প্রক্রিয়াটি বেশ কঠিন।’
বেন উড উল্লেখ করেছেন যে, স্যামসাং এবং হুয়াওয়ের মতো কোম্পানির ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বর্তমান বাজার স্মার্টফোন বিক্রির মাত্র ২ শতাংশ।
ডেটা ও অ্যানালিটিক্স ফার্ম এফডিএম সিসিএম ইনসাইটের মতে, অ্যাপলের সংস্করণটি আগ্রহ ও চাহিদা বাড়ালেও, আগামী দশকে এর বিক্রি মোট বাজারের মাত্র ৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইফোন অ্যাপলের সর্বাধিক বিক্রিত পণ্য এবং এটি প্রতি বছর কোম্পানিটির মোট বিক্রয়ের অর্ধেকেরও বেশি অবদান রাখে।
সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকগুলোতে কোম্পানিটি গর্ব করে বলেছে যে, আইফোনের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এবং ডিভাইসটির সর্বশেষ সংস্করণটি তাদের সবচেয়ে সফল পণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ।
কোম্পানিটি তাদের অডিও এবং চ্যাট অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরি-র আসন্ন পুনঃপ্রবর্তন সম্পর্কেও আরও তথ্য প্রকাশ করেছে, যাকে তারা এখন সিরি এআই নামে অভিহিত করছে।
আইফোন ১৮ থেকে সিরি ব্যবহারকারীর মেসেজ ও ইমেইল ঘেঁটে তথ্য খোঁজা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাজ করার সক্ষমতা পাবে। নতুন অ্যাপল ওয়াচেও কথোপকথনের নোট নেওয়া ও তা লিখে ফেলার মতো এআই ফিচার থাকবে।
অ্যাপলের ক্রেইগ ফেডেরিগি নতুন এআই সুবিধাগুলোকে ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তিগত কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য গোপন থাকবে। অধিকাংশ এআই ফিচার ডিভাইসেই চলবে এবং প্রয়োজনে ক্লাউডে পাঠানো তথ্যও গোপন রাখা হবে। অ্যাপলও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ করতে পারবে না বলে তিনি দাবি করেন।


