শান্ত স্বভাবের লিওনেল মেসিকে সচরাচর মাঠে এতটা উত্তেজিত হতে দেখা যায় না। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ। রেফারির ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সরাসরি আঙুল উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে।
কানসাসে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের প্রথমার্ধে মাঠের রেফারি জোয়াও পেদ্রো সিলভা পিনেইরোর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি মেসি।
একটি ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় ঘটনার সূত্রপাত হয়। রেফারি মেসিকে ডিফেন্সিভ ওয়াল থেকে আরও কিছুটা পেছনে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে উষ্মা প্রকাশ করেন আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক।
রেফারির দিকে আঙুল উঁচিয়ে মেসিকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা বলার সময় ভদ্রতা বজায় রাখুন। কাউকে অসম্মান করবেন না। আমার সাথে সম্মান প্রদর্শন করে কথা বলুন, কারণ আমিও আপনাকে সম্মান দেখিয়েই কথা বলছি।’
ম্যাচের ৪৩ মিনিটে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। সুইস মিডফিল্ডার জিবরিল সাওকে লেয়ান্দ্রো পারেদেস স্পর্শ না করলেও ফাউলের বাঁশি বাজান রেফারি। এর পরপরই পারেদেসকে কড়া ট্যাকল করায় সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখান তিনি।
বিতর্ক আর উত্তেজনার মাঝেও ফুটবল জাদুকর মেসি তার পায়ের জাদু দেখাতে ভুল করেননি। ম্যাচের ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় মেসির পাস থেকে দুর্দান্ত এক গোল করেন আলেক্সিস মাক আলিস্তার।
এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে ১০টি অ্যাসিস্ট করার অভাবনীয় রেকর্ড গড়েন মেসি।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের আঘাতে মেসির ডান চোখের নিচে কেটে রক্ত পড়তে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে বিষয়টি রেফারির নজর এড়িয়ে গেলেও সেই চোট নিয়েই খেলা চালিয়ে যান তিনি।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে দান এনদোয়ের গোলে সমতায় ফেরে সুইজারল্যান্ড। তবে সমতা ফেরানোর ঠিক পরপরই দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো।
১০ জনের দলে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টানাকে ১-১ গোলে আটকে রাখে সুইজারল্যান্ড।
তবে, ম্যাচের ১১২তম মিনিট- ইতিহাসের পাতায় যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বদলি ফুটবলার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের পাস থেকে বল পান ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেস। পেনাল্টি বক্সের বাম প্রান্ত থেকে আলভারেস নিলেন এক অবিশ্বাস্য, বাঁকানো শট। ফুটবলটি যেন বাতাসে এক অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে সুইস গোলরক্ষকের প্রসারিত হাতকে ফাঁকি দিয়ে টপ কর্নার দিয়ে জালে আছড়ে পড়ল। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা।
সুইজারল্যান্ড যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণে উঠেছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে, অতিরিক্ত সময়ের ইনজুরি টাইমে (১২০+১ মিনিট) সুইসদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন লাউতারো মার্তিনেস। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে পাওয়া বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন তিনি।
সেই গোলের পর অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে যা হলো, তাকে শব্দে রূপ দেওয়া অসম্ভব। এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনায় মেতে উঠল আর্জেন্টিনার ডাগআউট। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই নিশ্চিত হয়ে যায়- সব বাধা, সব শঙ্কা আর রক্তচাপ বাড়ানো রোমাঞ্চ পেরিয়ে ৩-১ ব্যবধানে সেমিফাইনালে পা রাখলো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এ ম্যাচ চিরকাল বেঁচে থাকবে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য হিসেবে।


