রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হঠাৎ ঝটিকা মিছিলের নেপথ্যে পুলিশের একাংশের যোগসাজশ থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বেসরকারি টেলিভিশন যমুনা টেলিভিশনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে। গুলশানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত এলাকায় একত্রিত হন নিষিদ্ধঘোষিত দলটির প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী। মাত্র এক মিনিটের এই ঝটিকা মিছিলে অংশ নেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে- নগরীর সবচেয়ে কড়া নিরাপত্তার এই এলাকায় কীভাবে তারা এত সহজে একত্রিত হলেন?
যমুনা টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশানে এই মিছিলের আগের রাতেই সুনির্দিষ্ট রুট প্ল্যান তৈরি করে আওয়ামী লীগ। ওই রাতে অনলাইনে গোপন মিটিং করে নেতাকর্মী ও বিশেষ প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়। মিটিং শেষে তাদের মধ্যকার কিছু চ্যাটিংয়ের তথ্য থেকে জানা যায়, গুলশান থানার বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহযোগিতার আশ্বাস ছিল আগে থেকেই।
চ্যাটিংয়ে নিশ্চিত করা হয় যে, মিছিলের সময় নির্দিষ্ট এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্য থাকবে না এবং উল্টো পুলিশ তাদের ‘ব্যাকআপ’ বা নিরাপত্তা সহায়তা দেবে। কোন কোন রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে না, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখাও সেখানে ঠিক করা হয়। অথচ এই গোপন বৈঠক ও পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গও জানতে পারেনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
এই ঘটনার পর থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে গুলশান থানা পুলিশ। অনুসন্ধানে ঘটনার দিন পুলিশের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়- এমন সত্যতাও পাওয়া গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনার দিন কেন একটি মাত্র ইউনিটকে ডিউটিতে রাখা হলো, বাকি দুটি ইউনিটকে কেন প্যারেডে পাঠানো হলো? কেন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় নিয়মিত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন না এবং কেনই বা সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো নজরদারি ছিল না?
তীব্র সমালোচনার মুখে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ এবং গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে কিছু গোয়েন্দা তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। পুলিশ হয়তো ধারণা করতে পারেনি যে জুমার নামাজের ঠিক আগমুহূর্তে এমন জমায়েত হতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে- যদি আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য বা ধারণা থাকে, তবে কেন নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলো না?
এ বিষয়ে বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, গুলশান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকা। এখানে বিদেশি রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক ও ভিআইপিরা বসবাস করেন। এই স্থানে নজরদারি আরও বহুগুণ বাড়ানো প্রয়োজন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক ও পেশাদার হতে হবে।
গুলশানের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জোনে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে এড়াতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।



