...|...|...

জাতীয়

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন

আগুনের গোলা থেকে বাঁচাতে স্ত্রীকে দোতলা থেকে নিচে ফেলে দেন মাসুদ

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৯:৫৭
Shares
আগুনের গোলা থেকে বাঁচাতে স্ত্রীকে দোতলা থেকে নিচে ফেলে দেন মাসুদ

আগুনের গোলা থেকে বাঁচাতে স্ত্রীকে দোতলা থেকে নিচে ফেলে দেন মাসুদ। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ার টেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে দোতলার একটি কক্ষ থেকে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন ইসমাইল রুহুল মাসুদ, তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনা এবং তাদের ভাগ্নিজামাই আশিক। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচতে স্ত্রীকে নিচে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ দেন মাসুদ। তবে নিচে পড়ার সময় গুরুতর আঘাত পান তারা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইনানীর পাটুয়ার টেক সৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আহতদের মধ্যে মাসুদ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ আছেন। তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনা রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মাসুদ সীনা গ্রুপের মার্চেন্ডাইজার এবং তার স্ত্রী প্রিমিয়ার ব্যাংকে চাকরি করেন। তারা ঢাকার উত্তরায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন।

মাসুদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পরিবারের ১০ সদস্য মিলে কক্সবাজারে বেড়াতে যান। ঘটনার আগের দিন তাদের একজন ঢাকায় ফিরে আসেন। শনিবার সবার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মাসুদ জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে হোটেল থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা থাকায় মুঠোফোনে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলেও সেটি বন্ধ করে তারা আবার শুয়ে পড়েন। এর দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই তারা পটমট শব্দ শুনতে পান। মুহূর্তেই চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।

মাসুদ বলেন, বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর তারা দরজার দিকে তাকান। এ সময় তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা ধোঁয়ার গন্ধ পেয়ে দরজার তালা খুলতেই করিডোরে জ্বলতে থাকা আগুনের বিশাল গোলা কক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়ে। করিডোর তখন পুরোপুরি আগুনে ঘেরা ছিল। ফলে অন্য কক্ষে থাকা স্বজনদের সতর্ক করা কিংবা তাদের উদ্ধারে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাননি তারা।

আগুন ও ধোঁয়ায় কক্ষের ভেতর অন্ধকার হয়ে আসে। বাইরে বের হওয়ার মতো অন্য কোনো পথ না পেয়ে তারা সামনের দিকের মোটা স্বচ্ছ কাচের একটি অংশ ভাঙার চেষ্টা করেন।

প্রথমে তিনজন মিলে কাচে জোরে জোরে লাথি মারেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। পরে কক্ষের এক কোণে থাকা কাঠের চেয়ার দিয়ে কাচে আঘাত করেন মাসুদ। একপর্যায়ে চেয়ারটির পা ভেঙে যায়। সেই ভাঙা পা দিয়ে তৃতীয়বার আঘাত করার পর কাচটি ভাঙতে সক্ষম হন তারা।

মাসুদ জানান, ততক্ষণে কক্ষের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি বিছানাতেও আগুন জ্বলছিল। নিচে নামার কোনো বিকল্প না থাকায় তিনি স্ত্রীকে দোতলার ভাঙা কাচের অংশ দিয়ে লাফ দিতে বলেন। কিন্তু ভয়ে মিনা কাচ ধরে ঝুলে থাকেন। পরে মাসুদ তার হাত ছাড়িয়ে স্ত্রীকে নিচে ফেলে দেন। এরপর তিনি নিজে এবং তার পেছনে থাকা আশিকও লাফ দেন।

নিচে পড়ার সময় একটি কুল বা বড়ইগাছের কারণে সরাসরি মাটিতে আঘাত পাননি মাসুদ। তবে এতে তার কোমরে তীব্র চোট লাগে। আঘাতের কারণে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। অন্যদিকে মিনার পায়ের একটি অংশ গভীরভাবে কেটে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।

আগুনের তীব্র উত্তাপ থেকে রক্ষা পেতে তারা হামাগুড়ি দিয়ে পাশের একটি ধানখেতে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে রিসোর্টের সামনে এসে দেখতে পান, ভেতরে আটকে পড়া লোকজন বাঁচার জন্য চিৎকার করছেন। তাদের স্বজনেরাও সন্তানদের উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে পানি চাইছিলেন।

এই ভ্রমণের পেছনে ছিল পরিবারের এক সদস্যের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা। মাসুদ জানান, তার বড় বোনের মেয়ে ফারিয়া কবির মায়োপ্যাথিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি একা কোথাও যেতে পারতেন না। জীবনে কখনো সমুদ্রও দেখেননি তিনি। ফারিয়ার সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই পরিবারের সবাই মিলে কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।

মাসুদ বলেন, ফারিয়া বলেছিল সে তো একা কোথাও যেতে পারে না, সবাই মিলে একসাথে গেলে সে সমুদ্র দেখতে পারবে। আমরা দুইবার ওকে কোলে করে এবং চেয়ারে বসিয়ে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গেছি। ও পানির সাথে খেলা করেছে, ভীষণ আনন্দ পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আসার পথে চাঁদের গাড়িতে বসে সে বলেছিল, ‘আমি যদি এই সমুদ্রের পাড়ে সব সময় থাকতে পারতাম, খুব শান্তি লাগত।’ আজ সত্যিই সে চিরতরে সমুদ্রের পাড়েই রয়ে গেল।

অগ্নিকাণ্ডের পর আহতদের প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার রাতে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ আছেন মাসুদ। তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা মিনাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।