যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের (ইউএস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস, বিএলএস) সর্বশেষ কর্মসংস্থান পূর্বাভাসে দেখা গেছে, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সাল- এই এক দশকে দেশটিতে মোট কর্মসংস্থান ১৭ কোটি ৩০ লাখ থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ৬২ লাখে দাঁড়াবে, যা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
তবে এই প্রবৃদ্ধি সব খাতে সমান হারে হবে না। স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে কর্মসংস্থান ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে নতুন করে যুক্ত হতে পারে প্রায় ২২ লাখ চাকরি, যা এই দশকে সৃষ্ট মোট নতুন চাকরির প্রায় ৩৭ শতাংশ।
জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং হৃদরোগ, ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিএলএসের তালিকা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০টি চাকরি হলো-
১. নার্স প্র্যাকটিশনার
প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, ৪১ শতাংশ- যা যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি। নার্স প্র্যাকটিশনাররা উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, যারা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রেসক্রিপশন লেখার মতো কাজ করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সম্প্রতি আইন সংশোধন করে তাদের এমন অনেক দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগে শুধু চিকিৎসকদের এখতিয়ারে ছিল।
চিকিৎসক-স্বল্পতার কারণে বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় তাদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের গড় বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা)।
২. সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী (সোলার ফটোভোলটাইক ইনস্টলার)
প্রবৃদ্ধির হার ৩৭ শতাংশ। বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও বৃহৎ সোলার ফার্মে সোলার প্যানেল স্থাপন, সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন তারা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বৈশ্বিক ঝোঁক এবং যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা- বিশেষ করে এআই ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে- এই পেশার চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গড় বার্ষিক বেতন ৫৩ হাজার ১৪০ ডলার (প্রায় ৬৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা)।
৩. তথ্যবিজ্ঞানী (ডেটা সায়েন্টিস্ট)
প্রবৃদ্ধির হার ৩৫ শতাংশ। বিশাল পরিমাণ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করাই এই পেশার মূল কাজ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এই পেশাকে প্রায় প্রতিটি শিল্পখাতে অপরিহার্য করে তুলেছে। গড় বার্ষিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার ২৩০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা)।
৪. বায়ু টারবাইন সেবা কারিগর
প্রবৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশ। বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন স্থাপন, পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ করেন তারা। যদিও এই পেশায় নিয়োগসংখ্যা তুলনামূলক কম (মোট কর্মীসংখ্যা এখনো ছোট), শতাংশের হিসেবে প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি- যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
গড় বার্ষিক বেতন ৬৪ হাজার ১২০ ডলার (প্রায় ৭৮ লাখ ৪ হাজার টাকা)।
৫. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপক
প্রবৃদ্ধির হার ২৪ শতাংশ। হাসপাতাল, ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, বাজেট নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন তারা।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামগ্রিক সম্প্রসারণের সাথে সাথে দক্ষ ব্যবস্থাপকদের চাহিদাও বাড়ছে। গড় বার্ষিক বেতন ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৬০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা)।
৬. শারীরিক চিকিৎসা সহকারী (ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট)
প্রবৃদ্ধির হার ২৩ শতাংশ। ফিজিক্যাল থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে রোগীদের পুনর্বাসন ব্যায়াম করানো, চলাফেরায় সহায়তা করাসহ নানা থেরাপিউটিক কাজ করেন তারা।
জনসংখ্যার বার্ধক্যের সাথে সাথে খেলাধুলার আঘাত, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় এই পেশার চাহিদা বাড়ছে। গড় বার্ষিক বেতন ৬৮ হাজার ৩৮০ ডলার (প্রায় ৮৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা)।
৭. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কারিগর (সাইকিয়াট্রিক টেকনিশিয়ান)
প্রবৃদ্ধির হার ২২ শতাংশ। মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের দৈনন্দিন যত্ন ও তত্ত্বাবধানে সহায়তা করেন তারা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার বাড়ায় এই পেশার চাহিদাও বাড়ছে। গড় বার্ষিক বেতন ৪৫ হাজার ১৩০ ডলার (প্রায় ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা)।
৮. কম্পিউটার ও তথ্য গবেষণা বিজ্ঞানী
প্রবৃদ্ধির হার ২২ শতাংশ। কম্পিউটার প্রযুক্তির নতুন পদ্ধতি ও অ্যালগরিদম উদ্ভাবনে গবেষণা করেন তারা- যার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো ক্ষেত্র।
প্রযুক্তি খাতের ক্রমাগত উদ্ভাবনের চাহিদাই এই পেশার প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। গড় বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৪০ হাজার ৩০০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা)- তালিকার মধ্যে সর্বোচ্চ বেতনের পেশা এটি।
৯. পেশাগত চিকিৎসা সহকারী (অকুপেশনাল থেরাপি অ্যাসিস্ট্যান্ট)
প্রবৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ। শারীরিক, মানসিক বা উন্নয়নমূলক সীমাবদ্ধতায় ভোগা রোগীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম পুনরায় করতে সক্ষম করে তোলার থেরাপিতে সহায়তা করেন তারা।
জনসংখ্যার বার্ধক্যের সাথে এই সেবার চাহিদাও বাড়ছে। গড় বার্ষিক বেতন ৭২ হাজার ৩০০ ডলার (প্রায় ৮৮ লাখ ১ হাজার টাকা)।
১০. চক্ষু চিকিৎসা কারিগর (অপথালমিক মেডিকেল টেকনিশিয়ান)
প্রবৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ। চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনা এবং চক্ষু চিকিৎসকদের সহায়তা করার কাজ করেন তারা। বয়সজনিত চোখের সমস্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই পেশার চাহিদাও বাড়ছে।
গড় বার্ষিক বেতন ৪৫ হাজার ৫৭০ ডলার (প্রায় ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা)।
(টাকার অঙ্ক আনুমানিক, প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে; প্রকৃত বিনিময় হার সময়ে সময়ে ওঠানামা করে)
তালিকার বাইরেও যা লক্ষণীয়
শীর্ষ ১০- এর বাইরে বিএলএসের সম্পূর্ণ তালিকায় আরও কিছু উল্লেখযোগ্য পেশা রয়েছে- যেমন তথ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষক (২১%), চিকিৎসা সহকারী বা ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট (২১%), কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ-কারিগর (১৮-১৯%), মহামারিবিদ (এপিডেমিওলজিস্ট, ১৯%), মাদকাসক্তি ও আচরণগত সমস্যা পরামর্শক (১৮%), হোম হেলথ ও পার্সোনাল কেয়ার এইড (১৮%) এবং শিল্প যন্ত্রপাতি মেকানিক (১৮%)।
এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট, স্বাস্থ্যসেবা প্রায় প্রতিটি স্তরেই- উচ্চদক্ষ চিকিৎসক থেকে শুরু করে সহায়ক কর্মী পর্যন্ত- দ্রুত সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে। তবে সব খাতের চিত্র একরকম নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার শিল্প, নকশা, বিনোদন, ক্রীড়া ও গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু পেশার চাহিদা সীমিত করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিএলএস।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারি চাকরির সংখ্যা ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও আছে- কেবল শতকরা প্রবৃদ্ধির হার দেখে কোনো পেশার প্রকৃত সুযোগ বিচার করা ঠিক নয়। যেমন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী ও বায়ু টারবাইন কারিগর- এই দুই পেশা মিলিয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ নতুন চাকরি যুক্ত হতে পারে ১৫ হাজারেরও কম, যেখানে নার্স প্র্যাকটিশনারের মতো পেশায় যুক্ত হতে পারে লক্ষাধিক চাকরি- যদিও প্রবৃদ্ধির হার কাছাকাছি।
সব মিলিয়ে তথ্য বলছে, আগামী দশকের শ্রমবাজারে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তিনির্ভর পেশারই চাহিদা বাড়বে না; স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের পেশাগুলোও একইসাথে দ্রুত সম্প্রসারিত হতে চলেছে- আর এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো জনসংখ্যার বার্ধক্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ এবং জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতের রূপান্তর।
তথ্যসূত্র: U.S. Bureau of Labor statistics (bls.gov)



