...|...|...

জাতীয়

অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে এপিবিএন, যুক্ত হচ্ছে সাইবার টিম

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:২১ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১:২৪
Shares
অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে এপিবিএন, যুক্ত হচ্ছে সাইবার টিম

নতুন আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের স্পষ্ট আইনগত ক্ষমতা পেয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। সরকারের, আদালতের বা আইজিপির মাধ্যমে ন্যস্ত করা মামলাই তদন্ত করবে বিশেষায়িত এই বাহিনী। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় এপিবিএনে সাইবার টিম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় এপিবিএন সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাহিনীর সদর দপ্তরের ডিআইজি (অ্যাডমিন) ড. মোহাম্মদ শাহজাহান।

তিনি বলেন, নতুন আইনে এপিবিএনকে তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে বাহিনীটি সব ধরনের মামলা তদন্ত করবে না। সরকার, আদালত কিংবা আইজিপির মাধ্যমে যেসব মামলা এপিবিএনের কাছে ন্যস্ত করা হবে, সেগুলোরই তদন্ত করবে তারা।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৬’ পাস হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ’ বাতিল করে নতুন আইনি কাঠামো করা হয়েছে। নতুন আইনে এপিবিএনের দায়িত্ব ও কার্যপরিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এপিবিএনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো তদন্তের ক্ষমতা। এতদিন নির্দিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও নিজস্বভাবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ন্যস্ত মামলার তদন্ত করতে পারবে বাহিনীটি।

নতুন এই ক্ষমতা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘটিত অপরাধের তদন্তে বিশেষভাবে কাজে লাগবে বলে মনে করছে এপিবিএন। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় জেলা পুলিশের ওপর বড় ধরনের চাপ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পের নিরাপত্তায় এপিবিএন সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধের ধরন অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ এলাকার তুলনায় ভিন্ন। সেখানে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, নারী নির্যাতন ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধ তদন্তে এপিবিএনের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

নতুন সদস্যদের জন্য সাত দিনের একটি পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত উপকরণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশে সাইবার অপরাধ বাড়তে থাকায় নতুন আইনে এপিবিএনের জন্য সাইবার সেল বা বিশেষায়িত টিম গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নজরদারি জোরদারে ড্রোন, রাতের অন্ধকারে ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্র এবং সিসিটিভি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নতুন আইনে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সেখানে সংঘটিত অপরাধের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। এতদিন বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করলেও এপিবিএনের আইনগত এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ছিল। নতুন আইনে বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্দিষ্ট অপরাধের তদন্তে বাহিনীটির ভূমিকার আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিমানবন্দরে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজন মনে করলে এপিবিএন সেই মামলার তদন্ত করতে পারবে। তবে সব মামলা তারা তদন্ত করবে না। বাহিনীর সক্ষমতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নির্দিষ্ট মামলার দায়িত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। এপিবিএনের সঙ্গে অন্য কোনো বাহিনীর বিরোধ নেই। আইন ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতেই দায়িত্ব পালন করা হবে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নীতিমালার কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। বিমানবন্দরে অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আইন প্রয়োগে পুলিশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, নতুন আইনে এপিবিএনের দায়িত্বের আইনগত ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয়ের বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্বও নতুন আইনে এপিবিএনের কার্যপরিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে এ ধরনের দায়িত্ব পালন করা হলেও এবার তা আইনগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা এলাকা, বিমানবন্দর, পার্বত্য অঞ্চল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় এপিবিএনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাকে এপিবিএনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি জানান, প্রায় ১৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তার বিপরীতে সেখানে এপিবিএনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২০০। এই জনবল অনুপাতের কারণে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ছে।

জনবল সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ইউনিট থেকেও জনবল এনে ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও মানবপাচার নিয়েও এপিবিএনের কার্যক্রম তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে ইয়াবা তৈরির কারখানা থাকার তথ্য তারা পাননি। তবে বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে মাদক ক্যাম্পে প্রবেশ করে। ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্তে কাজ চলছে।

তিনি জানান, ক্যাম্পে অবৈধভাবে ওষুধ তৈরি ও সরবরাহের ঘটনায় ইতোমধ্যে অভিযান চালানো হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতাকারীদের শনাক্তেও কাজ চলছে।

নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর এপিবিএনের দায়িত্ব পালনের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জনবল ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এপিবিএন পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ পুলিশিংয়ে যুক্ত না হয়ে নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়া হবে।

নতুন আইনে তদন্তের ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় এপিবিএনের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই ক্ষমতা নির্দিষ্ট মামলা ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই প্রয়োগ হবে। তদন্তের মান নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও চলছে।