...|...|...

অর্থনীতি

৫৫ বছর পর অর্থবছর পরিবর্তন: কেন করল সরকার, লাভ-ক্ষতিই বা কী

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৩:০৬ | আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:১১
Shares
৫৫ বছর পর অর্থবছর পরিবর্তন: কেন করল সরকার, লাভ-ক্ষতিই বা কী

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশে প্রচলিত অর্থবছরের কাঠামোয় আসছে বড় পরিবর্তন। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত যে অর্থবছর হিসাব করা হয়, তা পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন এই পদ্ধতি কার্যকর হবে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের যুক্তি, অর্থবছরের শেষ সময় পরিবর্তন করলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে, বিশেষ করে বর্ষাকালের কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয় তা কমবে।

তবে দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার এই উদ্যোগ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। কেউ মনে করছেন, সময়সূচির পরিবর্তন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, শুধু অর্থবছরের ক্যালেন্ডার বদলালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থাপনায় সংস্কার।

কেন বদলানো হচ্ছে অর্থবছর?

সরকারের মূল যুক্তি, বর্তমানে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল, মে ও জুনে দেশে বর্ষা শুরু হয়। এ সময় সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি কমে যায়, মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

নতুন ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষ তিন মাস হবে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ। সরকারের আশা, শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পের কাজ শেষ করার সুযোগ বাড়বে এবং বছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার প্রবণতা কমবে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বছর হিসেবে ধরা হবে। ওই অর্থবছর জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত নয় মাসে শেষ হবে। এরপর ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে নতুন অর্থবছর পদ্ধতি চালু হবে।

অর্থবছর কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অর্থবছর হলো সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবের নির্ধারিত ১২ মাসের সময়কাল। এই সময়ের ভিত্তিতেই বাজেট তৈরি, রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ব্যয়, ঋণ ও জিডিপির হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে জুলাই-জুন অর্থবছর চালু রয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একটি বিশেষ স্বল্পমেয়াদি বাজেট দিয়েছিলেন। এরপর নিয়মিতভাবে জুলাই থেকে জুন সময়কেই অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে।

মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা এই ব্যবস্থাই পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশেও বহাল থাকে।

বিশ্বের কোন দেশ কোন অর্থবছর অনুসরণ করে?

অর্থবছরের জন্য বিশ্বব্যাপী কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। প্রতিটি দেশ নিজেদের অর্থনীতি, কৃষি, আবহাওয়া ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও মিশর জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণ করে। অন্যদিকে ভারত, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর প্রচলিত। চীন, জার্মানি ও ব্রাজিল জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর চলে অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

সম্ভাব্য সুবিধা কী?

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

তাদের মতে, বর্ষাকাল অর্থবছরের শেষের পরিবর্তে মাঝামাঝি সময়ে পড়বে। ফলে মার্চের মধ্যে বড় প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া জুন মাসের শেষ দিকে বাজেট বাস্তবায়নের হার দেখাতে গিয়ে যে তাড়াহুড়ো করে অর্থ খরচের প্রবণতা দেখা যায়, তা কিছুটা কমতে পারে।

কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। ধান-চাল সংগ্রহ, সার ও বীজের ভর্তুকি পরিকল্পনা নতুন অর্থবছরের সঙ্গে আরও সমন্বিত করা সহজ হতে পারে।

শুধু সময় বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের মত, অর্থবছরের সময় পরিবর্তন একাই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনবে না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের গুণগত পরিবর্তন না আনলে শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তনে বড় কোনো ফল পাওয়া যাবে না।

তার মতে, প্রকল্পের সময়মতো শেষ না হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলো সমাধান না করলে নতুন ক্যালেন্ডারেও একই সমস্যা থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বাজেটের বড় অংশই রাজস্ব ব্যয়। এর সঙ্গে বর্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যার পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার বিষয়েও নজর দিতে হবে।

বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ

৫৫ বছরের পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন অর্থবছর চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও হিসাব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, ব্যাংক ও বিমা খাতের হিসাব, কোম্পানির অডিট সময়সূচি—সবকিছু নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও হিসাব সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থবছর জুলাই-জুন হওয়ায় নতুন ব্যবস্থায় সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

সরকারের প্রত্যাশা

সরকার বলছে, অর্থবছর পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও কার্যকর করা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় গতি আনা।

এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করবে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন অর্থবছর দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর।

তথ্যসূত্র: বিসিসি বাংলা