...|...|...

বিশ্ব

৩০০ সহকর্মীকে হত্যা করিয়ে ইউক্রেনে পালালেন রুশ সেনা কর্মকর্তা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৫
Shares
৩০০ সহকর্মীকে হত্যা করিয়ে ইউক্রেনে পালালেন রুশ সেনা কর্মকর্তা

ছবি: সংগৃহীত

রুশ সেনাবাহিনীর গোপন তথ্য ও যুদ্ধকৌশল ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়ে প্রায় ৩০০ রুশ সেনার মৃত্যুর কারণ হয়েছেন ২৬ বছর বয়সি এক তরুণ রুশ সেনা কর্মকর্তা। এরপর ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্র পেরিয়ে ইউক্রেনে পালিয়ে গিয়ে পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি সামরিক ইউনিটে যোগ দিয়েছেন তিনি। 

সম্প্রতি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেভ স্তুপনিকভ নামের ওই রুশ কর্মকর্তা রাশিয়ান আর্মিতে নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সংবেদনশীল সামরিক তথ্য পাচার করতেন। সেনা চলাচল, ব্যাটল প্ল্যান বা যুদ্ধকৌশল ছাড়াও রিকনসেন্ট বা ড্রোন এবং নজরদারি ক্যামেরার লাইভ ফিড পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তবে তার এই গোপন কর্মকাণ্ডের ব্যক্তিগত মূল্যও কম দিতে হয়নি। ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্ত্রী তার বিরুদ্ধে রাশিয়া এবং তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক—উভয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনেছেন।

যেভাবে ইউক্রেনকে সহায়তা করেন স্তুপনিকভ

সিগনাল কর্পসের বুদিয়নভ সামরিক একাডেমির সাবেক গ্র্যাজুয়েট স্তুপনিকভকে দোনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান দুর্গ ভুহলেদার দখলের দায়িত্বে থাকা একটি ব্যাটালিয়নের প্রধান সিগনাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার কাজ ছিল কমান্ডারদের সাথে ইউনিটগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করা এবং নজরদারি ব্যবস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি গোপনে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে রুশ অবস্থান ও পরিকল্পিত গতিবিধি সম্পর্কে নিখুঁত বিবরণ সরবরাহ করতে শুরু করেন।

পূর্ব ইউক্রেনের এক কনকনে ঠান্ডার সকালে স্তুপনিকভ সহকর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য পেটে তীব্র ব্যথার ভান করেন। এরপরই তিনি যে স্থানাঙ্ক বা কোঅর্ডিনেট শেয়ার করেছিলেন, সেখানে ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

ওই হামলায় কিয়েভের অন্যতম শীর্ষ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত কর্নেল গুসেইন মুসায়েভসহ ৬৮ জন রুশ সেনা নিহত হন এবং আরও ৬০ জন আহত হন। হামলা শেষে এক ইউক্রেনীয় যোগাযোগ ব্যক্তি স্তুপনিকভকে মেসেজ করে জানতে চেয়েছিলেন, কোনো বিস্ফোরণ হয়েছে কি? ছবি পাঠাও। জবাবে স্তুপনিকভ লিখেছিলেন, ওখানে কেবল মাংসপিণ্ড রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে তথ্য প্রদানে ইচ্ছুক এমন রুশ নাগরিকদের নিয়ে পরিচালিত একটি বৃহত্তর গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন তিনি। সেনা ও গৃহিণীসহ হাজার হাজার মানুষ এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখছেন।

যেভাবে বদলে গেল স্তুপনিকভের জীবন

নিজের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত একদিনে হয়নি; মূলত ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতাই তাকে এই পথে ঠেলে দেয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কো যখন পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু করে, তখন ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান রুশ হেলিকপ্টারগুলো ইউক্রেনীয় শহরগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে এবং একের পর এক বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে। সেই দৃশ্যগুলো তাকে স্তব্ধ ও আতঙ্কিত করে তোলে।

তিনি বলেন, তারা নির্দোষ বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা ফেলছিল। এটা ছিল পুরোপুরি পৈশাচিক। চলমান এই যুদ্ধের মাঝে তার সহকর্মীরা কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছিল, তা তার কাছে বোধগম্য হচ্ছিল না। বাড়িতে তিনি স্ত্রী লিজার সাথে বসে রুশ বিরোধী ব্যক্তিত্বদের ভিডিও এবং যুদ্ধবন্দি রুশ সেনাদের সাক্ষাৎকার দেখতেন।

এমনকি সামরিক একাডেমির ভেতরেও সমমনা কিছু ক্যাডেট একে অপরের দিকে এমন দৃষ্টি বিনিময় করতেন যা দিয়ে তারা নিজেদের ভেতরের ক্ষোভ বুঝতে পারতেন। একাডেমী ছাড়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন অনেকে। স্তুপনিকভ বলেন, আমি আমার আবেগ প্রকাশ করতে পারিনি, কিন্তু ভেতরটা আগুনে পুড়ছিল।

মায়ের সহায়তায় ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সাথে যোগাযোগ

স্তুপনিকভের মা তাতায়ানা ইয়ান্টসিয়েনও পুতিনের ঘোর বিরোধী। ৪৯ বছর বয়সি এই অফিস কর্মী পুতিন শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে—ছেলে ফ্রন্টলাইনে যোগ দেওয়ার তিন মাস পর—তিনি দিমিত্রো কার্পেনকো নামের এক কম্পিউটার প্রোগ্রামারের সাথে যোগাযোগ করেন, যিনি ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। কার্পেনকো এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রুশ তথ্যদাতাদের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। এছাড়া ইউটিউবে রুশ যুদ্ধবন্দিদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেও তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলেন। ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সামরিক তথ্য দেওয়ার বিনিময়ে অনেক সেনাই তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে কার্পেনকো ঘোষণা করেছিলেন যে, ইউক্রেনকে তথ্য দিতে ইচ্ছুক রুশ সামরিক কর্মীদের আড়াই লাখ রুবল (প্রায় ২ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার) পুরস্কার দেওয়া হবে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত স্তুপনিকভের পলায়ন নিশ্চিত করা হয়। কার্পেনকো, ইউক্রেনীয় স্কাউট এবং স্তুপনিকভ—সবাই মিলে এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে অত্যন্ত বিপজ্জনক ফ্রন্টলাইন পেরিয়ে যাওয়ার রুট ঠিক করেন।

ফ্রন্টলাইন পেরিয়ে রোমাঞ্চকর পলায়ন

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাতের আঁধারে নিজের রুশ ইউনিট থেকে পালিয়ে উত্তর দিকে ইউক্রেনীয় অবস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন স্তুপনিকভ। একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার থেকে লাইভ ভিডিও ফিড দেখে ইউক্রেনীয় অপারেটররা রিয়েল-টাইমে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

প্রায় ৪০ মিনিট চলার পর তিনি এমন একটি গাছপালার কাছে পৌঁছান যেখানে ইউক্রেনের ৭২তম ব্রিগেডের সেনারা অবস্থান করছিলেন। রুশ ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে দেখে বাঙ্কার থেকে উঁকি দিয়ে ইউক্রেনীয় সেনারা তাদের রাইফেল তাক করেন এবং চিৎকার করে বলেন, পাসওয়ার্ড কী?

পূর্বনির্ধারিত সাংকেতিক উত্তর হিসেবে স্তুপনিকভ বলেন, চিনাবাদামের। এরপরই তাকে নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তিনি ‘রাশিয়ান ভলান্টিয়ার কর্পস’-এ যোগ দেন, যা পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত রুশদের নিয়ে গঠিত একটি ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিট। বর্তমানে তিনি সেখানে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্তুপনিকভের মা ও বোন একটি করে ব্যাকপ্যাক ও স্যুটকেস গুছিয়ে মলদোভার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ইউক্রেনে প্রবেশ করে কার্পেনকোর সাথে মিলিত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এদিকে তাতায়েকানা মাসের পর মাস রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের ফোন সামলিয়েছেন যারা চাইছিলেন তিনি যেন তার ছেলেকে আত্মসমর্পণ করতে রাজি করান। একজন বিপর্যস্ত মায়ের ভান করে তিনি বলতেন, ছেলেকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ প্রশাসনের।

এক বছর পর কার্পেনকোর সাথে দুই ঘণ্টার এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের পুরো গল্পটি প্রকাশ করেন স্তুপনিকভ। এই সাক্ষাৎকারটি তার দলত্যাগ এবং ইউক্রেনকে সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে স্তুপনিকভের দাবি, তার এই কর্মকাণ্ড প্রায় এক দশক আগে সামরিক একাডেমিতে নেওয়া শপথের সাথেই সংগতিপূর্ণ। তিনি তার দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস, পুতিনের আগ্রাসন সেই মৌলিক নীতিগুলোকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, আমি কি আমার শপথের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি? আমি তো স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু পুতিন তো এই তিনটেই ধ্বংস করে দিয়েছেন।