...|...|...

খেলা

২০ কোটি টাকা খরচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি এক টুকরো তামা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:৩৭
Shares
২০ কোটি টাকা খরচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি এক টুকরো তামা

ছবি: সংগৃহীত

সোনার চেয়ে তামার দাম বেশি কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু জাপান এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে সেটিই যেন বাস্তবতা। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় করে ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র একটি তামার পদক। সোনা তো দূরের কথা, রৌপ্যও জোটেনি। বিপুল অর্থ খরচের বিপরীতে এমন হতাশাজনক ফল এখন প্রশ্ন তুলছে, এত বড় বহর নিয়ে গেমসে অংশ নেওয়ার আদৌ কতটা প্রয়োজন ছিল।

জাপান এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) শুরুতে ৩৭ কোটি টাকার বাজেট করেছিল। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তা কমিয়ে ২০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে। এই অর্থ ব্যয়ে ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয় বাংলাদেশ। ২৬০ সদস্যের বিশাল বহর যায় জাপানে। সেখানে ক্রীড়াবিদের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। শেষ পর্যন্ত উশুতে জিন্নাত আক্তারের পাওয়া তামার পদকই বাংলাদেশের একমাত্র সান্ত্বনা।

তবে সেই পদকও এসেছে অনেকটা ভাগ্যের জোরে। উশুর নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনালে উঠলেই পদক নিশ্চিত। কোয়ার্টার ফাইনালে জিন্নাতের প্রতিপক্ষ না আসায় তিনি সরাসরি সেমিফাইনালে উঠে যান। পরে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে হেরে যান। ফলে কোনো ম্যাচ না খেলেই সেমিফাইনালে ওঠার সুবাদে তার গলায় ঝোলে তামার পদক।

এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ভালো করবে এমন প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না। তবে দেশ ছাড়ার আগে বাংলাদেশের শেফ দ্য মিশন কয়েকটি ডিসিপ্লিন নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিলেন। পুরুষ ও নারী ক্রিকেট, পুরুষ ও নারী কাবাডি, আর্চারি, শুটিং ও সাঁতারে ভালো ফলের প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রায় কিছুই পূরণ হয়নি।

পুরুষ ক্রিকেট দলকে ঘিরে পদকের আশা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তামাও জোটেনি। নারী ক্রিকেটেও হয়েছে হতাশাজনক পারফরম্যান্স। কাবাডি একসময় এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অন্যতম ভরসার জায়গা ছিল। এবার পুরুষ ও নারী দুই দলই ব্যর্থ। পুরুষ দল এক দিনে দুটি ম্যাচ জিতে যে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা কোনো পদকে রূপ নেয়নি।

আর্চারি নিয়েও দেশে বড় প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু জাপানে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। শুটিং ও সাঁতারেও ব্যর্থতা। অ্যাথলেটিকসসহ অন্য ডিসিপ্লিনগুলোর অবস্থাও ছিল প্রায় একই। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যেখানে পদকের সম্ভাবনা ছিল না, সেখানে এতগুলো ইভেন্টে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?

ক্রীড়াবিদদের অভিজ্ঞতা অর্জনের যুক্তি অবশ্য থাকতেই পারে। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তো বিবেচনায় রাখতে হবে। বিভিন্ন ফেডারেশন প্রায়ই অর্থ সংকটের কারণে খেলোয়াড়দের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে পারে না বলে অভিযোগ করে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সীমিত বাজেটেও অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। অথচ বিদেশে বড় কোনো গেমস এলেই বাজেট যেন হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

জাপান এশিয়ান গেমসের জন্য ২০ কোটি টাকা খরচ হলেও এই অর্থের কতটা সরাসরি ক্রীড়াবিদদের পেছনে গেছে, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ ২৬০ সদস্যের বহরে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনকি কোচের পরিচয়ে কর্মকর্তাদের জাপানে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে পুরো আয়োজনকে ঘিরে ‘ক্রীড়া সফর নাকি পিকনিক’ এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বড় আন্তর্জাতিক গেমসের দল ও বহর নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের। সরকার যেখানে সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধের কথা বারবার বলছে, সেখানে এত বড় বহর পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে জবাবদিহি থাকা জরুরি। দলের প্রয়োজনে কতজন কর্মকর্তা দরকার, কার কী দায়িত্ব এবং বিদেশ সফরে কারা যাচ্ছেন এসব বিষয় স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন ফেডারেশনের নির্বাচন, অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হলেও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। অথচ বড় গেমসগুলোতে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং বহর নির্ধারণের সিদ্ধান্তের সাথে তারাই সরাসরি যুক্ত। তাই বিওএর কার্যক্রম, নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।

আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কমিটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বিওএর কমিটি কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে এবং সেই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকাকালে সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। ওই প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এমনকি বিলুপ্ত কমিটির প্রভাব বর্তমান বিওএর ওপর রয়েছে এমন কথাও শোনা যায়। যদিও এর সত্যতা নিশ্চিত নয়।

জাপান এশিয়ান গেমস তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ব্যর্থতার গল্প নয়, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের হিসাবও সামনে এনেছে। ২০ কোটি টাকা খরচ করে যদি প্রাপ্তি হয় মাত্র এক টুকরো তামা, তাহলে ভবিষ্যতের গেমসে দল পাঠানোর নীতি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিনে বিনিয়োগ, ক্রীড়াবিদদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তার বহর কমানো এসব নিশ্চিত করা না গেলে শুধু অর্থ খরচ হবে, কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না।