চলমান ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দর্শকদের নজর কেড়েছে খেলোয়াড়দের পায়ের জুতো। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই মাঠের সবুজ ঘাসে দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল গোলাপি বা ফুশিয়া রঙের বুটের আধিক্য।
উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার লড়াইয়ে দুই দলের ২২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে মাত্র ৩ জন ছাড়া বাকি সবার পায়েই ছিল কোনো না কোনো শেডের গোলাপি বুট। কিলিয়ান এমবাপ্পে, এরলিং হলান্ডের মতো বিশ্বতারকা থেকে শুরু করে কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের মতো ছোট দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও এই একই রঙের বুট পরার প্রবণতা দেখা গেছে।

কিন্তু কেন এই আসরে গোলাপি বুটের এত ছড়াছড়ি? এর পেছনে রয়েছে বিপণন কৌশল, মনস্তত্ত্ব এবং ফ্যাশন ট্রেন্ডের এক দারুণ সমন্বয়।
ব্র্যান্ড প্রচার ও বিপণন কৌশল
অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা, নিউ ব্যালান্স এবং স্কেচার্স- বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের নতুন বুট বাজারে এনেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের বুটের রঙের আলাদা নাম দিয়েছে। যেমন- অ্যাডিডাসের নাম ‘সোলার টার্বো’, আর পুমার নাম ‘পয়জন পিঙ্ক’।
নিউ ব্যালান্সের ফুটবল পণ্যের প্রধান রব শেলডনের মতে, উজ্জ্বল রঙের বুট মাঠে খেলোয়াড়দের সহজে খুঁজে পেতে সতীর্থদের সাহায্য করে। একই সাথে গ্যালারি ও টেলিভিশনের কোটি কোটি দর্শকের নজর সরাসরি ব্র্যান্ড লোগোর দিকে আকর্ষণ করার এটি একটি মোক্ষম বাণিজ্যিক কৌশল।

এখনকার ফুটবলাররা নিজেরাও একেকজন বড় ব্র্যান্ড। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিউ ব্যালান্সের পাঁচজন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোট অনুসারীর সংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি। ফলে বুটের রঙে তাদের আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোও এই বিপণনের অংশ।
নাইকি ফুটবলের ফুটওয়্যার পণ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ওডিঙ্গা নিমাকো জানান, খেলোয়াড় ও সাধারণ ক্রেতা- উভয় পক্ষই এখন উজ্জ্বল ও সাহসী রঙের প্রতি আগ্রহী। তারা এমন একটি রঙ খুঁজছিলেন যা সবচেয়ে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী মনোভাব ফুটিয়ে তোলে, আর সে কারণেই তারা গোলাপিকে বেছে নিয়েছেন।
ভোক্তা প্রবণতা ও ট্রেন্ডের পূর্বাভাস
এই গোলাপি বুটের জোয়ার কিন্তু হুট করে আসেনি। ২০২৪ সালের মে মাসেই আন্তর্জাতিক ভোক্তা প্রবণতা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ডাব্লিউজিএসএন পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালে ‘ইলেকট্রিক ফুশিয়া’ (গোলাপি ও বেগুনির মিশ্রণ) রঙটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। মানুষের মধ্যে দৃশ্যমানতা, আশাবাদ এবং নিজেকে প্রকাশ করার চাহিদা বাড়ার কারণেই এই রঙের উত্থান।
বর্তমানে বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হওয়া সমস্ত গোলাপি বুটের প্রায় ৪৮.২ শতাংশ জুতোই এই উজ্জ্বল গোলাপি শেডের। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ক্রীড়া অর্থনীতিতে রঙ এখন কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, এটি একটি বড় বাণিজ্যিক সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।

বিশ্বখ্যাত জুতা ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ান ট্রেসারের মতে, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও প্রবণতা বিশ্লেষকেরা যখন একই ধরনের তথ্য ও উৎস ব্যবহার করেন, তখন সব ব্র্যান্ডের চিন্তাভাবনা একই ধারায় প্রবাহিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রযুক্তির সাথে রঙের সমন্বয়
ভোক্তারা বা খেলোয়াড়েরা শুধু সুন্দরের জন্য এই বুট পরছেন না। প্রতিটি ব্র্যান্ডই তাদের বুটে সর্বোচ্চ মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যা খেলোয়াড়দের গতি ও পারফরম্যান্স বাড়াতে সাহায্য করে।

কোনো খেলোয়াড়ই শুধু রঙের জন্য বিশ্বকাপের মাঠে নামেন না। রঙ মূলত সেই উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন পণ্যের গল্পটিকে সবার সামনে দৃশ্যমান করার একটি আকর্ষণীয় মাধ্যম মাত্র।
নিয়মের ভিড়ে কিছু ব্যতিক্রম
তবে এই গোলাপি বুটের ভিড়ে কিছু ব্যতিক্রমও চোখে পড়ছে। যখন প্রায় সবাই গোলাপি বুট পরছেন, তখন অন্য যেকোনো রঙের বুটই বরং বেশি চোখে পড়ছে। যেমন- আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে পরেছিলেন আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী হালকা নীল ও সাদা রঙের মিশ্রণে তৈরি বিশেষ ‘এল উলতিমো ট্যাঙ্গো’ বুট। এই ম্যাচে তিনি ৩টি গোলও করেন।

একইভাবে মার্কিন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচকেও দেখা গেছে পুমার ভিন্ন রঙের বিশেষ সংস্করণের বুটে। তবে সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ যেন ফুটবলারদের পায়ের জুতোর মাধ্যমে একটি বিশাল ‘গোলাপি প্রদর্শনী’তে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: সিএনএন

