...|...|...

চট্টগ্রাম

হাতি শাবক আগলে সাড়ে তিন ঘণ্টা সড়কে হাতির পাল

রাঙামাটি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:০০ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫১
Shares
হাতি শাবক আগলে সাড়ে তিন ঘণ্টা সড়কে হাতির পাল

বাচ্চা হাতিকে সুরক্ষা দিতে রাঙামাটির আসামবস্তি-কাপ্তাই সংযোগ সড়কে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অবস্থান করেছে একদল বন্য হাতি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে হঠাৎ সড়কে নেমে আসে হাতির পালটি। এ সময় সড়কের ওপর ও দুই পাশে অবস্থান নেয় হাতিগুলো। বাচ্চা হাতিটিকে মাঝখানে রেখে বড় হাতিগুলো চারপাশ থেকে পাহারা দিতে থাকে। এতে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন থেমে যায় এবং আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, হাতির পালে ছিল প্রায় এক বছর বয়সী একটি বাচ্চা হাতি, তার মা-বাবা এবং একটি তরুণ প্রজন্মের হাতি। খাবারের সন্ধানে বনের ভেতর ঘোরাঘুরি ও খাবার খাওয়ার পর হাতির দলটি আবার বনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এ সময় সড়কে গাড়ির চলাচল ও শব্দকে তারা হুমকি হিসেবে নেয়। বাচ্চা হাতির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পুরুষ হাতিটি সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় পাহারা দেয়।

হাতির আচরণ পর্যবেক্ষণকারীদের মতে, হাতির পালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাচ্চা হাতির নিরাপত্তা। বাচ্চা হাতি যে দিকে যায়, সাধারণত পালের অন্য হাতিরাও সেদিকেই যায়। বাচ্চা কোনো জায়গায় থেমে গেলে বড় হাতিরাও অনেক সময় সেখানে অবস্থান করে। সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাচ্চাটিকে রক্ষা করতে তারা চারপাশে অবস্থান নিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। ফলে এ সময় হাতিদের খুব কাছাকাছি যাওয়া বা তাদের চলাচলে বাধা দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সড়কে হাতির অবস্থানের সময় অনেক যানবাহন দূরে থেমে যায়। কেউ কেউ নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। দীর্ঘ সময় পর হাতির পাল ধীরে ধীরে সড়ক ছেড়ে বনের দিকে চলে যায়। পরে স্বাভাবিক হয় যান চলাচল।

আসামবস্তি-কাপ্তাই সংযোগ সড়কটি নির্মাণের পর গত কয়েক বছরে এই সড়কে বন্য হাতির আনাগোনা বেড়েছে। ফলে নিয়মিতই সড়কের বিভিন্ন অংশে হাতির দেখা মিলছে। বিশেষ করে বিকেল, গোধূলি ও সন্ধ্যার পর হাতির চলাচল তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ সময় সড়কে চলাচলকারীদের বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আসামবস্তি-কাপ্তাই সংযোগ সড়কের প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশ কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা হাতির চলাচলের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব এলাকায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল রয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই সড়কে হাতির আক্রমণে অন্তত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১২ থেকে ১৫ জন। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিনিয়ত হাতি ও মানুষের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটায় বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাতের ঝুঁকিও।

বন বিভাগ বলছে, হাতি সড়কে উঠে এলে কোনোভাবেই তাদের কাছে যাওয়া, হর্ন বাজানো, ঢিল ছোড়া, চিৎকার করা কিংবা ছবি বা ভিডিও ধারণের জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে বাচ্চা হাতি থাকলে মা-বাবা হাতি অত্যন্ত সতর্ক ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তাই হাতি দেখলে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে তাদের স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।

স্থানীয়দের দাবি, হাতির চলাচলের করিডোরগুলোতে আরও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, বন বিভাগের টহল জোরদার এবং সন্ধ্যার সময় সড়ক ব্যবহারকারীদের সতর্ক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পাশাপাশি হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

বন বিভাগের পক্ষ থেকেও গোধূলি ও সন্ধ্যার সময় ঝুঁকি এড়াতে এই সড়ক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ, বনের ভেতর থেকে খাবারের সন্ধানে বের হওয়া কিংবা আবার বনে ফেরার সময় হাতির সাথে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বাচ্চা হাতিকে আগলে রাখার এমন দৃশ্য যেমন বিরল ও আকর্ষণীয়, তেমনি এর ভেতরে রয়েছে মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও। হাতির আবাসস্থল ও করিডোর রক্ষা এবং মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলেই মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।