ওজন বাড়লেই অনেকেই বলেন, ‘হরমোনের সমস্যা হয়েছে।’ আবার কেউ কেউ মনে করেন, শরীরে কোনো একটি হরমোনের মাত্রা বেড়ে বা কমে গেলেই স্থূলতা তৈরি হয়। তবে বাস্তবে বিষয়টি বেশ জটিল।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্থূলতা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, মানসিক চাপ, জিনগত বৈশিষ্ট্য, ওষুধ এবং বিভিন্ন রোগ সবকিছু মিলেই ওজনের ওপর প্রভাব ফেলে।
ইনসুলিন ও চর্বি জমার সম্পর্ক
ইনসুলিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বাড়লে ইনসুলিন নিঃসৃত হয় এবং গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো অবস্থায় বিপাকীয় ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। শুধু ‘ইনসুলিন বেশি’ বলেই ওজন বৃদ্ধির পুরো কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
লেপটিন ও ঘ্রেলিন: ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেত
লেপটিন মূলত চর্বি কোষ থেকে নিঃসৃত হয় এবং মস্তিষ্ককে শরীরে সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ সম্পর্কে সংকেত দেয়। স্থূলতার ক্ষেত্রে লেপটিনের মাত্রা অনেক সময় বেশি থাকলেও তার সংকেতের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে। একে লেপটিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। ফলে তৃপ্তির সংকেত যথাযথভাবে কাজ নাও করতে পারে।
অন্যদিকে, ঘ্রেলিনকে সাধারণভাবে ক্ষুধা উদ্দীপক হরমোন বলা হয়। খালি পেটে এর মাত্রা বাড়ে এবং খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়াতে পারে। ঘুমের ঘাটতিও ঘ্রেলিন ও অন্যান্য ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে।
কর্টিসল ও মানসিক চাপ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সাথে কর্টিসল ও শরীরের বিপাকীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস বেশি খাওয়া, বিশেষ করে উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ এবং পেটের আশপাশে চর্বি জমার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু ‘কর্টিসল বেশি হলেই পেটের মেদ বাড়ে’ এমন বক্তব্য বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।
থাইরয়েড হরমোনের ভূমিকা
থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। হাইপোথাইরয়েডিজমে বিপাকের হার কমে যেতে পারে এবং ওজন বাড়তে পারে। তবে থাইরয়েডের সমস্যা সাধারণত অতিরিক্ত স্থূলতার একমাত্র কারণ নয়।
তাই শুধু ওজন বাড়ার কারণে নিজের ইচ্ছায় থাইরয়েডের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে TSH ও Free T4 পরীক্ষা করা হয়।
নারী ও পুরুষের যৌন হরমোন
ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ও টেস্টোস্টেরন শরীরের চর্বি বণ্টন, পেশির পরিমাণ এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। বয়স, মেনোপজ, স্থূলতা এবং বিভিন্ন অন্তঃস্রাবীয় সমস্যার কারণে এসব হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন হরমোনের পরিবর্তনের সাথে শরীরের চর্বি বণ্টন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে কম টেস্টোস্টেরনের সাথে পেশির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং শরীরে চর্বি বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা যায়। তবে এখানেও একটি হরমোনকে বিচ্ছিন্নভাবে দায়ী করা ঠিক নয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো ওজন বাড়ার জন্য কি শুধু হরমোন দায়ী?
উত্তর হলো - না।
হরমোন শরীরের ক্ষুধা, তৃপ্তি, গ্লুকোজ বিপাক, শক্তি ব্যয় এবং চর্বি সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্থূলতা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, যেখানে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, মানসিক চাপ, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ এবং কিছু ওষুধ বা রোগ একসাথে ভূমিকা রাখতে পারে।
ওজন বাড়লে শুধু ‘হরমোন ঠিক করতে হবে’ এমন ধারণার বদলে প্রয়োজন ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল্যায়ন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওজন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত করা।
রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ


