দেশে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, হঠাৎ করে হৃদ্যন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে না। বছরের পর বছর জীবনযাপনের কিছু ভুল অভ্যাস ও অবহেলাই ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। অথচ সচেতনতার অভাবে অনেকে ঝুঁকির মধ্যেই দিন কাটান।
ধূমপান ও তামাক
হৃদ্যন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রুদের একটি ধূমপান। তামাকের রাসায়নিক রক্তনালির ভেতরের দেয়ালে ক্ষত তৈরি করে, ধমনি সরু করে দেয় এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। জর্দা, গুল ও সাদা পাতার মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকও সমান ক্ষতিকর। যাঁরা ধূমপান করেন না, কিন্তু নিয়মিত অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন, তাঁরাও ঝুঁকিতে থাকেন।
অস্বাস্থ্যকর খাবার
ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, ডালডা, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও বেকারি পণ্যে থাকা ট্রান্স ফ্যাট এবং সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায়। এতে ধমনির ভেতরে চর্বি জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যা হার্ট অ্যাটাকের বড় কারণ।
অতিরিক্ত লবণ ও চিনি
বেশি লবণ খেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্যন্ত্রকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টিজাতীয় পানীয় ওজন ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি করে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
দিনের বড় অংশ বসে থাকা, হাঁটাচলা বা ব্যায়াম না করা আধুনিক জীবনযাপনের সাধারণ চিত্র। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অলস জীবনযাত্রা স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বাড়ায়, যার সবই হৃদ্রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমা হৃদ্রোগের গুরুতর ঝুঁকির লক্ষণ। স্থূলতা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যাও ডেকে আনে।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ বেশি থাকলে ধীরে ধীরে রক্তনালি ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হয়। অনেক রোগী ওষুধ নিয়মিত খান না বা নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করে দেন, যা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না বলে নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।
মানসিক চাপ ও অনিদ্রা
দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ও ঘুমের ঘাটতি রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। অনেকে মানসিক চাপ সামলাতে ধূমপান, অতিরিক্ত খাওয়া বা অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে।
পারিবারিক ইতিহাস ও বয়স
পরিবারে কম বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেও ঝুঁকি বাড়ে। এগুলো বদলানো যায় না, তবে এ ধরনের ব্যক্তিদের বাকি ঝুঁকিগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা আরও জরুরি।
বায়ুদূষণ
সাম্প্রতিক গবেষণায় বায়ুদূষণকেও হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সূক্ষ্ম ধুলিকণা ফুসফুস হয়ে রক্তে মিশে রক্তনালির প্রদাহ ও ক্ষতি করতে পারে। ঢাকার মতো দূষিত শহরের বাসিন্দাদের জন্য এটি বাড়তি উদ্বেগের বিষয়।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল
নিয়মিত অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদ্পেশি দুর্বল করে দিতে পারে।
ঝুঁকি এড়াতে করণীয়
চিকিৎসকেরা বলছেন, তামাক পরিহার, সুষম খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত রক্তচাপ, সুগার ও কোলেস্টেরল পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ্রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ঘাম হলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।


