বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের কাজ খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ একটি গান কিংবা একটি লাইভ কনসার্টের শ্রোতাদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই নির্ভর করে তার ওপর, যার উপস্থিতি থাকে সব সময়ই সকলের অগোচরে।
আরাফাত কীর্তি তেমনই একজন নিভৃতচারি সৃষ্টিশীল কারিগরদের একজন। যিনি একাধারে মিউজিক প্রডিউসার, মিক্সিং ও মাস্টারিং ইঞ্জিনিয়ার এবং লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে নিজের কাজের পরিধি গড়ে তুলেছেন।
স্টুডিওভিত্তিক সংগীত প্রযোজনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। মিউজিক প্রডিউসার ও মিক্সিং-মাস্টারিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি অসংখ্য গান, অ্যালবাম এবং অরিজিনাল সাউন্ডট্র্যাকে কাজ করেছেন, যা বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং শ্রোতাদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শিল্পীর নিজস্বতা, সংগীতের মাধুর্য্য এবং বাদ্যযন্ত্রের স্বাভাবিক ধ্বনি অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক ডিজিটাল সাউন্ডের মানকে উপস্থাপন করাই তার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তার কাজের অন্যতম আলোচিত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এবারের ঈদ সিনেমার সাউন্ডট্র্যাকগুলোতে। চলতি ঈদে চারটি বড় সিনেমার অফিসিয়াল সাউন্ডট্র্যাকের মিক্সিং ও মাস্টারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন আরাফাত কীর্তি। এর মধ্যে রয়েছে ‘প্রিন্স’ সিনেমার টাইটেল ট্র্যাক, ‘রাক্ষস’ সিনেমার ‘শুদ্ধতার প্রেম’, ‘কলকি’ ও ‘আমি রাক্ষস’, ‘দম’ সিনেমার ‘এই মন তোমাকে দিলাম ২.০’ এবং ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমার ‘ক্ষয়ে ক্ষয়ে’ গানগুলো। এসব কাজ বাংলাদেশি সিনেমার সংগীত প্রযোজনায় তার সক্রিয় উপস্থিতির আরেকটি উদাহরণ।
স্টুডিওর অভিজ্ঞতা থেকেই পরে লাইভ সাউন্ডের জগতে প্রবেশ করেন তিনি। বড় মঞ্চে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, লাইভ সাউন্ড শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি তাৎক্ষণিক মুহূর্তের সাথে তাল মিলিয়ে সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি শিল্প। প্রতিটি কণ্ঠ, প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র এবং পুরো পরিবেশনার ভিন্ন ভিন্ন আবেগ ও আঙ্গিক শ্রোতার কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াই একজন দক্ষ লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের মূল দায়িত্ব।
দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের সূক্ষ্ম সুর, কণ্ঠের স্বাভাবিক উষ্ণতা এবং অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি আধুনিক ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে উপস্থাপন করার দক্ষতা আরাফাত কীর্তির কাজকে আলাদা করেছে। আর এই দক্ষতার কারণেই দক্ষিণ এশীয় সংগীতের নিজস্ব স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সাউন্ডে তা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনেও নিয়মিত কাজ করছেন আরাফাত কীর্তি। আনন্দধারা আর্টস, পিন্রো মিডিয়া এবং নন্দন আর্টস-এর বিভিন্ন আয়োজনে তিনি লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। লন্ডনে বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যান্ড সোলস এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট-এর কনসার্টে তার সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং দর্শক ও শিল্পীর মধ্যে সংগীতের আবেগকে স্বাভাবিকভাবে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি শ্রীকান্ত আচার্য ও অনুপ জালোটা সহ দক্ষিণ এশিয়ার খ্যাতিমান শিল্পীদের কনসার্টেও তিনি কাজ করেছেন। ধারাবাহিকভাবে এসব আয়োজনে যুক্ত থাকার ফলে যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক আয়োজকদের কাছে তিনি একজন নির্ভরযোগ্য লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
আরাফাত কীর্তির কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি প্রযুক্তিকে শুধু একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি হলো শিল্পীর ভাবনা এবং শ্রোতার অনুভূতির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন। স্টুডিওতে সংগীত নির্মাণের অভিজ্ঞতা এবং লাইভ মঞ্চের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র শব্দ দর্শন গড়ে তুলেছেন।
বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য দুই দেশের সংগীতাঙ্গনে কাজের অভিজ্ঞতা তার সাউন্ড নিয়ে শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দক্ষিণ এশীয় সংগীতের নিজস্ব স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক আন্তর্জাতিক সাউন্ডের সঙ্গে সৃজনশীল সমন্বয়ই আরাফাত কীর্তিকে সমসাময়িক প্রজন্মের কাছে একজন ভিন্নধর্মী সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।


