কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। সৈকতের সুগন্ধা থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত এ সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধনকারী সাগরলতা ও বালিয়াড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশ-এমন অভিযোগ উঠেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাদের আশঙ্কা, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও নো ডেভেলপমেন্ট জোনে সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। এ দাবিতে দুই সচিব, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ ১০ জনকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) বেলার পক্ষে আইনজীবী জাকারিয়া সুলতানা ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠান।
অন্যদিকে, সড়ক নির্মাণে পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকারী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুসরণের অনুরোধ জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) জেনারেল ম্যানেজার মো. আরিফুল ইসলামের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বিধিমালা, সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশ যথাযথভাবে অনুসরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ আট ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা থেকে সায়মন বিচ পয়েন্ট পর্যন্ত দৃশ্যমান বালিয়াড়ি এলাকায় নির্মাণাধীন সড়কের স্থান পরিদর্শন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, সুগন্ধা পয়েন্টসংলগ্ন সমুদ্র সৈকতের দৃশ্যমান বালিয়াড়িতে খননযন্ত্র দিয়ে বালু সমতল করে সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বালিয়াড়ি সমুদ্র উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এর স্বাভাবিক গঠন ও ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটলে উপকূলীয় ক্ষয়, বালু সঞ্চালন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সাথে উপকূলীয় প্রতিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে নির্মাণাধীন সড়কটির প্রয়োজনীয়তা, অবস্থান, নকশা এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, সড়ক নির্মাণের ফলে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন, বালু সঞ্চালন, উপকূলীয় ক্ষয়, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের মূল্যায়নসহ আট ধরনের তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্র, নির্মাণাধীন সড়কের জমির মালিকানাসংক্রান্ত খতিয়ান, দাগ, মৌজা ম্যাপ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ভূমি রেকর্ডও চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। বিধিমালা অনুযায়ী, এ এলাকায় মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মতি ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। ইসিএ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অন্য যেকোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে-সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এমন রায়ের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সৈকত রক্ষায় উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনাও রয়েছে বলে জানানো হয়।
কাজ বন্ধে বেলার আইনি নোটিশ
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ও নো ডেভেলপমেন্ট জোনে সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে বেলা।
নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন-পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর জেনারেল ম্যানেজার।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বেলার আইনজীবী জাকারিয়া সুলতানা।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নো ডেভেলপমেন্ট জোনে সড়ক নির্মাণ দেশের প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
নোটিশে আরও বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের নির্মাণনিষিদ্ধ এলাকায় সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম বন্ধ করে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের সংবেদনশীল পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করতে না পারা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের চরম ব্যর্থতার পরিচায়ক।


