...|...|...

সারাদেশ

সেই রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:৪১
Shares
সেই রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী

স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে ১৫ বছরের স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহরও। তার মনে হয়েছিল, দিনের বেলা যাত্রা শুরু করলেও রাতে কুমিল্লায় পৌঁছাবে মেয়েটি। বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে যাত্রীদের নিজস্ব পছন্দের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু বলেননি। সেই যাত্রার পরিণতি হয় ভয়াবহ। বাস থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর তাজমিনের লাশ উদ্ধার করা হয় ধানখেত থেকে। 

পুলিশ বলছে, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সিএনজিচালক সুমন মিয়া। তবে বাড়ি ছেড়ে তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়া, তার সাথে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং শেষ যাত্রার ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে।

কক্সবাজার আইকনিক বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ বলেন, ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বুঝা উচিত ছিল, আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছাবে। ওরও (তাজমিন) বুঝা উচিত ছিল। আমি বলতে চাইছিলাম ওদের। কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে, তাই বলা হয়নি।

তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০) ও সে কক্সবাজার আইকনিক এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে কুমিল্লা ফেরার টিকিট কাটে। পরদিন বুধবার দুপুর ১টার দিকে বাসটি ছাড়ে। তাজমিন একাই যাত্রা করবে বলে তার জন্য সিঙ্গেল সিটের টিকিট কাটা হয়েছিল।

রাজুর দাবি, তাজমিন যেন নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছাতে পারে, সে জন্য হোয়াটসঅ্যাপে তার সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন তিনি। তবে সেই যোগাযোগের মধ্যেও তাজমিনের শেষ যাত্রার পরিণতি ঠেকানো যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য বাস থেকে নেমে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে হত্যা করেছেন সিএনজিচালক সুমন মিয়া (৩৫)। শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। তবে ঘটনার অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।

যেভাবে বাড়ি ছেড়ে কক্সবাজারে যায় তাজমিন

রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সাথে বিরোধের জেরে বাড়ি ছেড়েছিল তাজমিন। সে রাজুকে জানিয়েছিল, তার সৎমা তাকে শাসন করেন এবং নিজের মা মারা গেছেন। এরপর এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় সে। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকার সময় থেকেই রাজুর সাথে তার যোগাযোগ শুরু হয়। পরে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন।

তবে পরিবারের বক্তব্যে বাড়ি ছাড়ার সময় নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাজমিন নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছিল। এ সময় বাবা-মায়ের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকলেও সে কোথায় ছিল বা কার সাথে অবস্থান করছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

রাজুর দাবি, কক্সবাজারে থাকা অবস্থায় তাজমিনের বাবা তাকে একাধিকবার ফোন করে অবস্থান জানতে চান এবং বাড়ি ফিরে আসতে বলেন। বাবার সাথে ফোনে কথা বলার সময় তাজমিনকে শিগগিরই বাড়ি ফেরার কথা বলতে শুনেছিলেন তিনি। এরপরই মঙ্গলবার রাতে দুজন বাস কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের টিকিট কাটেন।

মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগ ছিল মায়েরও

ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সাথে শেষবার কথা হয়েছিল বলে জানান তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। সে সময় তাজমিন জানিয়েছিল, এক বান্ধবীর সাথে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন কেয়া খাতুন। কিন্তু বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানান তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন এবং তাকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। তারপরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীর কথা বলেছেন, তিনি বয়সে তাজমিনের চেয়ে বড়। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তিনি কুমিল্লায় থাকেন। হত্যাকাণ্ডে ওই নারীর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পরিবার ও শিক্ষকের বক্তব্যে উঠে এসেছে নানা তথ্য

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি ছিল খুব চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন বলে জানান শিক্ষক। তার ভাষ্য, বাড়িতে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বেরিয়ে যেত।

বাড়ি ছাড়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্ব কিংবা রাজুর সাথে সম্পর্কের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বাড়ি ছাড়ার পর কয়েক দিন ধরে তার অবস্থান, চলাফেরা এবং কার সাথে যোগাযোগ ছিল, সেসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।