...|...|...

সারাদেশ

সাজেকে পর্যটনের জৌলুস, চিকিৎসায় অন্ধকার

উচ্চপ্রু মারমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৫৪
Shares
সাজেকে পর্যটনের জৌলুস, চিকিৎসায় অন্ধকার

স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের নানা সংকট—যার মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম। ছবি: টাইমস টুডে

সব হয়, সব বদলায়—শুধু পাহাড়ের মানুষের চিকিৎসা-সংকট আর হাহাকার যেন আগের মতোই থেকে যায়। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। মেঘ-পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। সাজেকের পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে আছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের নানা সংকট—যার মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম পাহাড়ি জনপদ সাজেক ও আশপাশের এলাকায় জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সাধারণ অসুস্থতা থেকে শুরু করে জটিল রোগ, দুর্ঘটনা কিংবা প্রসূতি মায়েদের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। গুরুতর রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দূরের হাসপাতালে নিতে হয়। এতে সময় যেমন লাগে, তেমনি পথের দুর্ভোগও বাড়ে। জরুরি মুহূর্তে এই দীর্ঘ যাত্রা রোগীর জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাজেকের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয় মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। পর্যটকদের জন্য আবাসন, সড়ক যোগাযোগ ও অন্যান্য সুবিধা বাড়লেও স্থানীয় জনগণের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এখনো অধরা।

বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে ভোগান্তি বেশি। রাতের বেলায় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও জটিল রোগের চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত।

‘জীবন বাঁচাতে আগে হাসপাতাল দরকার’

সাজেকের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা চাই না শুধু পর্যটকরা সাজেকের সৌন্দর্য দেখতে আসুক। এই পাহাড়ে যারা বছরের পর বছর বসবাস করছে, তাদের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়েও ভাবতে হবে। একজন মানুষ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকা তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু এখানে গুরুতর রোগী হলে দূরের হাসপাতালে নিতে হয়। পথ যত দুর্গম, ঝুঁকিও তত বেশি।’

আরেক বাসিন্দার ভাষায়, ‘পর্যটনের জন্য যদি সাজেকে এত উন্নয়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে স্থানীয় মানুষের জন্য একটি আধুনিক হাসপাতাল করা কেন সম্ভব হবে না? আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া জরুরি সময়ে যেন একজন রোগীকে বাঁচানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিতে না হয়।’

স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো প্রসূতি মায়েদের জরুরি চিকিৎসা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা সবসময় সহজলভ্য না থাকায় প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় একটি সুসজ্জিত হাসপাতাল, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, জরুরি ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

সাজেক এখন দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের সাথে সাথে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, ‘আমরা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, পর্যটনের উন্নয়নও চাই। কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে পাহাড়ের মানুষকেও রাখতে হবে। পর্যটকরা যেন নিরাপদে ঘুরতে পারেন, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষও যেন নিরাপদে বাঁচতে পারেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

সাজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপনের দাবি তাই শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণের দাবি নয়; এটি দুর্গম পাহাড়ি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সাজেকে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ নেবে।

পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসেন। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরে বসবাস করা মানুষগুলোর জীবনও যেন উন্নয়নের আলো পায়—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।

তাদের প্রশ্ন একটাই—সাজেকে পর্যটনের জন্য যদি এত আয়োজন হতে পারে, তাহলে পাহাড়ের মানুষের জীবন বাঁচাতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল কবে হবে?