...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

শৈশব গিলছে ডিজিটাল স্ক্রিন, আড়ালে বাড়ছে মাইওপিয়া

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:০৩
Shares
শৈশব গিলছে ডিজিটাল স্ক্রিন, আড়ালে বাড়ছে মাইওপিয়া

ছবি: সংগৃহীত

একসময় বিকেল নামলেই পাড়া-মহল্লার গলি কিংবা মেঠোপথে উঠত শৈশবের কলতান। মাঠের ধুলোবালি, ঘুড়ি ওড়ানো, সহপাঠীদের সাথে ছোটাছুটি কিংবা হরেক রকমের খেলাধুলায় মেতে উঠতো একদল দূরন্ত শিশু। ধুলাবালি মেখে সূর্য ডোবার পর বাড়ি ফেরা আর মা-বাবার হালকা বকুনি এটাই ছিল চিরচেনা শৈশবের রঙ। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই কোলাহল আজ রূপ নিয়েছে নিস্তব্ধতায়। সেই চিরচেনা শৈশব এখন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। দুরন্ত শৈশবের জায়গা দখল করে নিয়েছে চার কোনার একটি কাচের পর্দা- স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের ঘুমানোর আগে পর্যন্ত চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে ডিজিটাল স্ক্রিন।

চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিনে শৈশব বন্দি হওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতার কারণে শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে চোখের রোগ, বিশেষ করে 'মাইওপিয়া' বা দৃষ্টিস্বল্পতার ঝুঁকি।

তারা বলছেন, ​পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিনোদন, খেলার সাথী কিংবা গল্পের বই- সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন, ট্যাব আর ল্যাপটপে। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা শিশুদের বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে এনে দাঁড় করিয়েছে চার দেয়ালের কৃত্রিম আলোয়। আর এই স্ক্রিনে শৈশব থমকে যাওয়ার মাশুল দিতে হচ্ছে চোখের স্বাস্থ্য দিয়ে। 


শান্ত রাখার এক 'ভুল' মাশুল

​সাড়ে তিন বছরের চঞ্চল ছেলে আফিফ হোসাইনকে সামলে ঘরের কাজ করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল মা হাফসা বেগমের। কান্না থামাতে একদিন সন্তানের হাতে তুলে দেন মোবাইল। ফোনের কার্টুন চালু হতেই সে নিমেষেই শান্ত। এরপর ​সংসারের কাজ নির্বিঘ্ন করতে মা-ও আর বাঁধা দেননি,চলতে থাকে বছরের পর বছর। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তিই আফিফের জীবনে ডেকে আনে ভয়ংকর অভ্যাসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে খাওয়া, ঘুম বা অবসর সবকিছুতেই তার চাই স্মার্টফোন।

​সম্প্রতি পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর হঠাৎই ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখতে শুরু করলে তাকে রাজধানীর ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড ডিভিশনে দেখান। পরে চিকিৎসক জানান,অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের কারণে তার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে (মাইওপিয়া)। জানান, এখন থেকে তাকে সারাজীবন পরতে হবে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাফসা বেগমের আকুতি, “কাজের সুবিধার জন্য সেদিন যদি ওর হাতে ফোন না দিতাম, আজ আমার ছেলের এই অবস্থা হতো না।”

এমন ঘটনা শুধু আফিফের ক্ষেত্রেই নয় সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও চক্ষু হাসপাতালগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের একটি বড় অংশেরই প্রধান সমস্যা দৃষ্টিস্বল্পতা। অনেক কম বয়সেই শিশুদের চোখে উঠছে মোটা ফ্রেমের চশমা। আর এসবের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে দেখা ডিজিটাল স্ক্রিন। 

এমন বাস্তবতায় আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব দৃষ্টি দিবস। এবছরের প্রতিপাদ্য হলো ' আপনার চোখকে ভালবাসুন' 

গবেষণা যা বলছে

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীত ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ দৈনিক গড়ে ৫ ঘণ্টা মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের স্ক্রিনে বা পর্দায় চোখ রেখে সময় কাটান। এতে, তাদের ঘুমের ব্যঘাত, ওজন বাড়া, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

গবেষণাটি বলছে, দুই বছর ধরে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিশুর ওপর তারা পরীক্ষা চালায়। গবেষণার ফলাফল জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়েছে।

২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে ঢাকার দুই ( দক্ষিণ ও উত্তর) সিটি করপোরেশনের তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যমের মোট ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর এই গবেষণা করা হয়। প্রতিটি স্কুল থেকে ৭০ জন করে শিক্ষার্থী নেওয়া হয় যাদের বয়স ছিল ৬ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এরা ছিল দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রতিটি শ্রেণি থেকে ১০ জন করে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন শিশু (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় কাটায় স্ক্রিনে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় অনেক কম।এছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার বেশি।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই দায়ী

বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে চশমা ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ ‘মাইওপিয়া’ বা স্বল্পদৃষ্টি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিশন আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মুহাম্মদ আসিফুর রহমান টাইমস টুডেকে বলেন, বংশগত কারণের পাশাপাশি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনই শিশুদের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

তিনি বলেন, আজকালের শিশুরা দিনের একটি বড় অংশ মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা টানা বই পড়ার মতো ‘নিয়ার-ওয়ার্ক’ বা ঘরের ভেতরের কাজকর্মে কাটাচ্ছে। একই সাথে আউটডোর বা প্রাকৃতিক আলোতে তাদের সময় কাটানোর সুযোগ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক ‘স্কুল আই-হেলথ’ সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুদের মাইওপিয়া প্রতিরোধে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা খোলা আলো-বাতাসে বা মাঠে খেলাধুলা করা অত্যন্ত জরুরি।

চশমা ব্যবহার নিয়ে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, অনেকে মনে করেন চশমা পরলেই বুঝি চোখের পাওয়ার আরও বাড়তে থাকে যা সম্পূর্ণ ভুল। বরং চোখের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চশমা না পরা কিংবা চিকিৎসকের পরিমাপের চেয়ে কম পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করা শিশুর জন্য বেশি ক্ষতিকর। চোখের সঠিক সুরক্ষায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ পাওয়ারের চশমা পরানোই বিজ্ঞানসম্মত।

অভিভাবকদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিতে গিয়ে ডা. আসিফুর রহমান বলেন, শিশুদের চোখের সুরক্ষায় প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিন বা ডিভাইস ব্যবহার না করতে দিয়ে মাঝে মাঝে বিরতি দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে বই পড়া বা স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্কুলে নিয়মিত চোখের জ্যোতি পরীক্ষা  নিশ্চিত করা উচিত। এ ছাড়া শিশু যদি দূরের লেখা দেখতে না পায়, টিভির খুব কাছে গিয়ে বসে, চোখ কুঁচকে দেখে, মাথাব্যথার কথা বলে কিংবা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায় তবে দেরি না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুকে চশমা দেওয়া নয়; বরং মাইওপিয়া শনাক্ত করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা।