...|...|...

সারাদেশ

শহর পরিষ্কার রাখতে হাওড়ের পাড়ে বর্জ্য

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:৩১
Shares
শহর পরিষ্কার রাখতে হাওড়ের পাড়ে বর্জ্য

শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি, কিন্তু সেই বর্জ্য কি হাওড়ের বুকেই ঠাঁই পাবে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভার বর্জ্য ফেলার জন্য হাইল হাওড় সংলগ্ন এলাকায় স্থান নির্বাচনের প্রস্তাব ঘিরে এমন প্রশ্নই তুলেছেন স্থানীয়রা। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আশঙ্কায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন হাওড় পাড়ের হাজারো কৃষক, মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষ।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের অলিপুর ও মতিগঞ্জ মৌজায় হাইল হাওড়ের কোল ঘেঁষে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত কয়েকদিন ধরে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় জনতা। তাদের পরিষ্কার বক্তব্য, শহর পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, কিন্তু হাওড়কে ময়লার ভাগাড় বানিয়ে নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যে স্থানটিতে বর্জ্য ফেলার প্রস্তাব করা হয়েছে তার মাত্র দেড়শ ফুট দূরেই রয়েছে মাদ্রাসা, এতিমখানা, মসজিদ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশপাশে রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের বসতি ও শত শত বিঘা উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি। উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলা হলে দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।

একজন ক্ষুব্ধ কৃষক বলেন, এখানে যাতে ময়লা না ফালানো হয়, চা বাগানের কোনো স্থানে ফালানো হোক। আর যদি এখানে ময়লা ফালানো হয় আমাদের আগে বিষ খাইয়া মাইরা ফালান ভালা হইবো। মৌলভীবাজার হলো হাওর দেশ, হাওর রক্ষা না করলে দেশ থাকবে না। যেখানে ময়লা ফালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হইছে তার পাশে মসজিদ-মাদ্রাসা আছে। আমরা কৃষক, যদি কৃষি খেত করতে না পারি ময়লার দুর্গন্ধে, তাহলে পেটে খাবার কিভাবে দিমু।

এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হাইল হাওড়কে ঘিরে। এই হাওড়ের সাথেই যুক্ত রয়েছে দেশের অন্যতম মৎস্য অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল, শাপলা বিলসহ প্রায় ৩০টি ইজারাকৃত সরকারি জলমহাল। শত শত জেলে পরিবার এই হাওড়ের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে বর্জ্যের দূষিত পানি ও লিচেট সরাসরি হাওড়ে গড়ালে হাওড়ের পানি দূষিত হবে। এতে বোরো ধানসহ ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি ধ্বংস হয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে হাইল হাওড়ের পরিবেশগত ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, এটি এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। প্রস্তাবিত স্থানে উন্মুক্ত ময়লা না ফেলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাই পরিবেশের বড় ক্ষতির আশঙ্কা কম।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী খাসজমি সন্ধান করা হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবেশগত সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকৌশলী ও প্রতিনিধি দল আসবেন। সম্পূর্ণ পরিবেশসম্মত উপায়ে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করা হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

তিনি আরও জানান, উন্মুক্ত ডাম্পিং নয়, বরং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই এই প্রকল্প ভাবা হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসেও ভরসা পাচ্ছেন না হাওড় পাড়ের মানুষ। তাদের দাবি, হাওড় থেকে দূরে, জনবসতিহীন কোনো পরিত্যক্ত টিলা বা চা বাগানের অনুর্বর জমিতে এই ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হোক।

এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের আশ্বাসে আস্থা রাখবেন কি হাওড় পাড়ের হাজারো কৃষক-মৎস্যজীবী, নাকি পরিবেশ রক্ষার দাবিতে তাদের আন্দোলন আরও জোরালো হবে।