...|...|...

সারাদেশ

যে মায়ের আঁচলে ছিল আশ্রয়, সেই মায়ের ঠাঁই এখন জঙ্গলে

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:০১
Shares
যে মায়ের আঁচলে ছিল আশ্রয়, সেই মায়ের ঠাঁই এখন জঙ্গলে

জঙ্গল। ছবি: সংগৃহীত

মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা, চারপাশে মলমূত্র—৭৫ বছরের অসুস্থ বৃদ্ধাকে ফেলে রাখার অভিযোগ বড় মেয়ের বিরুদ্ধে। একসময় যে মায়ের আঁচলে সন্তানদের ছিল নিরাপদ আশ্রয়, বয়সের ভারে সেই মায়েরই এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই! অসুস্থ শরীর, চলাফেরার অক্ষমতা আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৭৫ বছরের জেলেকা বেগমের রাত কাটছে ঘন জঙ্গলে খোলা আকাশের নিচে। মাথার নিচে প্লাস্টিকের একটি বস্তা, পরনে ময়লা কাপড়। চারপাশে মলমূত্র, পোকামাকড়ের উপদ্রব আর বন্য প্রাণীর আতঙ্ক। এমনই অমানবিক পরিবেশে পড়ে কাঁদছিলেন তিনি।

তিন মেয়ের মা জেলেকা বেগমের জীবনের শেষ বয়সে এসে এমন দুরবস্থার পেছনে বড় মেয়ে ময়না বেগমের অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ, অসুস্থ মাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম। তার দাবি, মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং সেখানে থাকতে চান না। ঘটনাটি শুধু একজন অসহায় বৃদ্ধার দুর্দশার চিত্র নয়; বরং বার্ধক্যে মা-বাবার নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে জেলেকা বেগমকে জঙ্গলের মধ্যে ওই অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা ও আশপাশের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত করুণ। অসুস্থ ও চলাফেরায় অক্ষম হওয়ায় নিজের উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সামর্থ্যও তার সীমিত।

জেলেকা বেগম স্থানীয়দের কাছে অভিযোগ করেন, গত ১০ অক্টোবর রাতে তার বড় মেয়ে ময়না বেগম তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তাকে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়। তার দাবি, মেয়ের বাড়িতে থাকাকালে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। তাকে গলা চেপে ধরা এবং লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগও করেন তিনি।

ঘর আছে, আশ্রয় নেই

জেলেকা বেগমের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। তার কোনো ছেলে নেই; রয়েছে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে ময়না বেগমের বয়স ৪৮ বছর। তিনি স্বামী ও এক ছেলেমেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে বসবাস করেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে থাকেন। ছোট মেয়ে সীমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে দেশে রয়েছেন।

দীর্ঘদিন ধরে বড় মেয়ে ময়না বেগমের বাড়িতেই থাকতেন জেলেকা বেগম। কিন্তু প্রতিবেশীদের দাবি, সেখানে তার জীবনযাপনের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।

তাদের ভাষ্য, ছোট দুই মেয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় বড় মেয়ে ময়না বেগমের বাড়িতে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই বাড়িতে থেকেও বৃদ্ধা মায়ের থাকার জায়গা হয়েছিল পুরোনো ও জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ঘরটিতে আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানান প্রতিবেশীরা।

একটি বাড়িতে পাকা ঘর থাকার পরও অসুস্থ বৃদ্ধার জীবন কেন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এভাবে একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবেন?’ প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃদ্ধা যেভাবে জঙ্গলে পড়ে আছেন, তাতে যেকোনো সময় শিয়াল-কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে পারেন। সাপ-বিচ্ছুরও ভয় রয়েছে। রাতের অন্ধকারে মাটির ওপর একা পড়ে থাকেন তিনি। এভাবে একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবেন?’

আরেক প্রতিবেশী তোফাজ্জেল অভিযোগ করেন, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। কখনো শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হতো, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হতো না। যে পাত্রে তাকে খাবার দেওয়া হতো, সেই পাত্রে কুকুর-বিড়ালও খেত বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগ অস্বীকার মেয়ের, সংসারে অভাবের কথা নাতির মায়ের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম। তার দাবি, মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না। 

অন্যদিকে ময়না বেগম বলেন, ‘আমি তাকে মারধর করি না। তার থাকার ঘরটিও আমরা সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখতাম। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক-দুই দিন তাকে গোসল করানো হতো।’

ময়না বেগমের কিশোর ছেলে মাসুমের ভাষ্য, তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। নিজেদের খাওয়া-দাওয়াই ঠিকমতো চলে না। এর মধ্যেও তারা নানির দেখাশোনা করেন। তার অভিযোগ, নানির অন্য দুই মেয়ে একবারের জন্যও খোঁজ নিতে আসেননি এবং কোনো খরচও দেন না।

পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে একদিকে আর্থিক সংকট ও দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে প্রতিবেশীরা তুলেছেন অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ। 

প্রশাসনের নজরে বিষয়টি

এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছেন। বৃদ্ধার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে সহায়তা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বৃদ্ধার বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরবর্তী সময়ে কে তার দেখাশোনা করবেন—এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

একজন মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন জঙ্গলের মাটিতে অসহায়ভাবে পড়ে থেকে না কাটে—এটাই এখন তাদের প্রত্যাশা। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক, দায় থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত হোক; আর সবার আগে, নিরাপদ আশ্রয় ও মানবিক মর্যাদা ফিরে পান বৃদ্ধা জেলেকা বেগম।