আজ ৩ নভেম্বর, জেল হত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা-অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং খাদ্য ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি গভীর শোক ও বেদনার।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় আড়াই মাস পর কারাগারের ভেতর তাদের হত্যা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পালাবদলে জাতীয় চার নেতার নেতৃত্ব যাতে ভূমিকা রাখতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
মধ্যরাতে কারাগারে সেনাসদস্যদের উপস্থিতি
বিবিসি বাংলার ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে তৎকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আমিনুর রহমানের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে কারাগারের প্রধান ফটকে একটি পিকআপ এসে থামে। গাড়িতে সশস্ত্র কয়েকজন সেনাসদস্য ছিলেন।
কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশে আমিনুর রহমান দ্রুত কারাগারে যান। সেনাসদস্যরা কারা মহাপরিদর্শকের কাছে একটি কাগজ দেন। এর কিছুক্ষণ পর জেলার কার্যালয়ের টেলিফোনে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি কথা বলবেন। পরে কারা মহাপরিদর্শক জেলারকে জানান, রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সেনা কর্মকর্তারা যা চান, তা-ই করতে হবে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে সেনাসদস্যদের সাথে কারা কর্মকর্তাদের কথাবার্তা চলতে থাকে। একপর্যায়ে কারাগারে বন্দি চার নেতাকে এক জায়গায় জড়ো করার নির্দেশ আসে। কারা মহাপরিদর্শক একটি কাগজে তাদের নাম লিখে দেন। তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ একটি কক্ষে ছিলেন। অন্য কক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে সেখানে আনা হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয় চার নেতাকে
জেলার আমিনুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করতে কিছুটা সময় লাগে। এ সময় সেনাসদস্যরা কারা কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। তাজউদ্দীন আহমদ তখন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হাত-মুখ ধুয়ে নেন। কারা কর্মকর্তারা তাদের জানান, সেনাসদস্যরা এসেছেন।
চার নেতাকে এক জায়গায় আনার পর তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। জেলার আমিনুর রহমান বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হত্যাকাণ্ডের সময়কার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
পরিবার জানতে পারে পরদিন
হত্যাকাণ্ডের দিন চার নেতার পরিবারের সদস্যরা কারাগারের ভেতরের ঘটনা জানতে পারেননি। তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার সারা দিন কারাগারের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেও কোনো তথ্য পায়নি।
৪ নভেম্বর পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় গিয়ে জানান, আগের দিন ভোরে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলির শব্দ শুনেছেন। ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে চার নেতাকে হত্যার খবর পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা তৈরি হয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে নেতৃত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হয়।
তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল হওয়া আমিন আহমেদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের পরিণতি ছিল কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে, ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত সেনা কর্মকর্তারা সম্ভাব্য পাল্টা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বহীনতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
মামলা ও বিচার
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। তবে দীর্ঘদিন মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির ছিল।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর মামলাটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে একটি বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
সাজাপ্রাপ্তদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাতেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে দেশে গ্রেফতার হন তিনি। একই মাসে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। তাদের স্মরণে প্রতিবছর ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস পালিত হয়।

