যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন এক নতুন ঐতিহাসিক অর্জনের পথ প্রত্যক্ষ করেছে। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ মিশিগান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেই প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে জয়ী হয়েছেন। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ফিলিস্তিনি ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিশ্চিত হওয়ায় নির্বাচনে প্রবাসীদের অংশীদারি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। একই সাথে নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের স্থানপ্রাপ্তিতে বৈচিত্র্যের নতুন নজির তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট লড়াইয়ে মাইক রজার্সকে হারিয়ে বিজয়ী হন আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মাধ্যমে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেটে আসন নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
এদিকে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন চিকিৎসক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ডক্টর আদম হামাওয়ি। এ ছাড়া স্থানীয় রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নাবিলা সৈয়দ এবং নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটে আবের কাওয়াসের বিজয় লাভ মূলধারার রাজনীতিতে মুসলিম ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুসলিমদের যেসব ঐতিহাসিক অর্জন
১. আবদুল আল-সাইয়েদ—যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট ৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল আল-সাইয়েদ। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম তার জয় নিশ্চিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হলেন তিনি।
মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও তার প্রচারে গুরুত্ব পায়।
২. আদম হামাওয়ি—নিউ জার্সির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট আদম হামাওয়ি। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত হলেন তিনি।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন এবং সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক। ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালনের সময় আহত সেনাদের চিকিৎসা করেছেন। সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ট্যামি ডাকওয়ার্থের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পর তার জীবন বাঁচাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। বসনিয়া, সুদান, লেবানন ও সিরিয়ায় মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় চিকিৎসাসেবা দিতে যান।
৩. নাবিলা সৈয়দ—ইলিনয় সিনেটে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধিত্ব
ইলিনয়ের সিনেটের ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট নাবিলা সৈয়দ। তিনি ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, বিপরীতে হিলস পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ। আসনটি আগে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নাবিলা ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে থেকে পড়াশোনা করা এই রাজনীতিক ভোক্তা অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এবার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে অঙ্গরাজ্যের আইন প্রণয়নে আরও বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
৪. আবের কাওয়াস—নিউইয়র্কে প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলিম নারী
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী আবের কাওয়াস। তার জয়ের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলিম নারী নির্বাচিত হলেন তিনি। কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস একজন কমিউনিটি সংগঠক। তার বাবা-মা ফিলিস্তিনি।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। আবাসন ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসীদের সুরক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ছিল তার প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সংগঠকের কাজ করেছেন কাওয়াস।
৫. রুয়া রোমান—জর্জিয়ায় মুসলিম ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বের অগ্রযাত্রা
জর্জিয়ার অঙ্গরাজ্য আইনসভায় মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক রুয়া রোমানের প্রতিনিধিত্বও নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে তিনি জর্জিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী ও প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ৭ম ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়ে উচ্চকক্ষে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন তিনি। প্রাথমিক ফলে রিপাবলিকান প্রার্থী আইজাজ শেখের বিরুদ্ধে তার বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হবে।
৬. ইলহান ওমর—কংগ্রেসে আবারও নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারীদের একজন
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ৫ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন। রাশিদা তালিবের সাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন। কংগ্রেসে দায়িত্ব পালনকালে অভিবাসীদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সরব ছিলেন তিনি। তার পুনর্নির্বাচন মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখল।
৭. রাশিদা তালিব—ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম কংগ্রেস সদস্যের আরেক জয়
মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব। ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান তালিব ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে প্রথম মুসলিম নারী সদস্যদের একজন হিসেবে ইতিহাস গড়েন। একই সাথে তিনি কংগ্রেসের প্রথম দুই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনপ্রণেতার একজন। কংগ্রেসে তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেছেন। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচক হিসেবেও পরিচিত তিনি। নতুন মেয়াদে তার জয় কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি ও মুসলিম প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী করল।
৮. আন্দ্রে কারসন—কংগ্রেসে দীর্ঘদিনের মুসলিম প্রতিনিধি
ইন্ডিয়ানার ৭ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালে বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে কংগ্রেসে আসেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত দ্বিতীয় মুসলিম সদস্য কারসন। তার আগে মিনেসোটা থেকে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কারসন কংগ্রেসের গোয়েন্দাবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সন্ত্রাসবাদ, পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম ও নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করেছেন। পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, পরিবহন ও কর্মসংস্থান নিয়েও তার ভূমিকা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে কংগ্রেসে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।


