যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও চূড়ান্ত ফল জানতে অপেক্ষা করতে হতে পারে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় সময় অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে। এরপর শুরু হবে ভোট গণনা। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে ফল ঘোষণা করতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
এবারের নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন, উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে ভোট হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের ফল জানতে শুধু জাতীয় পর্যায়ের ভোট গণনা নয়, রাজ্যভিত্তিক ফলাফলের দিকেও নজর রাখতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে একই সময়ে ভোটগ্রহণ শেষ হয় না। পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকেই প্রথম ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে শুরু করবে। এরপর সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে জর্জিয়া, ভার্জিনিয়া, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও পেনসিলভানিয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। রাত ৯টার দিকে টেক্সাস, মিশিগান ও উইসকনসিনের অধিকাংশ এলাকায় কেন্দ্র বন্ধ হবে। এরপর রাত ১১টায় ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন ও ওরেগনে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। সবশেষে আলাস্কা ও হাওয়াইয়ে ভোট শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, বুধবার (৪ নভেম্বর) ভোর ৫টার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে শুরু করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আসতে থাকবে প্রাথমিক ফলাফল। ফলে বাংলাদেশে বুধবার সকাল থেকেই নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রথম দিকে প্রকাশিত ফলাফলকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ভোট এবং ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ব্যালট যাচাই, গ্রহণ ও গণনার জন্য আলাদা সময় প্রয়োজন হয়। কোনো কোনো রাজ্যে ভোটের দিন পাওয়া ব্যালটের পাশাপাশি আগাম ভোটের হিসাবও পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হয়। ফলে প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান কম থাকলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা ও আলাস্কার মতো রাজ্যে ভোট গণনার প্রক্রিয়া তুলনামূলক দীর্ঘ হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটার ডাকযোগে ভোট দেন। এসব ব্যালট যাচাই ও গণনার কারণে কিছু আসনের ফল প্রকাশে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। অ্যারিজোনায় ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের স্বাক্ষর যাচাই করতে হয়। অন্যদিকে আলাস্কায় র্যাঙ্কড-চয়েস ভোটিং পদ্ধতি থাকায় কিছু নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন দলের হাতে যাচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন। তবে কোনো দল ৫০টি আসন পেলে ভাইস প্রেসিডেন্টের টাই-ব্রেকিং ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো ভোটের ফল বিশ্লেষণ করে কোনো আসনে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারে। তবে সংবাদমাধ্যমের এমন ঘোষণা সরকারি চূড়ান্ত ফল নয়। পর্যাপ্ত ভোট গণনা এবং প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের চিত্র স্পষ্ট হওয়ার পরই তারা এ ধরনের পূর্বাভাস দেয়। পরে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল নিশ্চিত করে।
আগের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতাও বলছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হতে চার দিন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ফল নির্ধারণে আট দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত নিশ্চিত হলেও প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে প্রায় আট দিন সময় লেগেছিল।
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির সুযোগও বাড়বে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। এ কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন বণ্টনের লড়াই নয়, বরং ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন পরিচালনার পথও নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় ভোর থেকে প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। বিশেষ করে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সামগ্রিক ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: রয়টার্স, এপি, বিবিসি, আলজাজিরা ও সিবিএস নিউজ।



