...|...|...

সারাদেশ

যশোরে তুলার আবাদ-উৎপাদনে নতুন গতি

ইমরান হোসেন রাজ, যশোর
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:২৩
Shares
যশোরে তুলার আবাদ-উৎপাদনে নতুন গতি

একসময় অবহেলিত ফসল হিসেবে পরিচিত তুলা এখন যশোরের কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। জমিতে তুলা চাষে সময় বেশি লাগলেও প্রচলিত অনেক ফসলের তুলনায় লাভ ভালো হওয়ায় এ অঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে তুলার আবাদ। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও সন্তোষজনক বাজারদরের কারণে কৃষকদের মধ্যেও তুলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ১০ বছর আগে যশোর অঞ্চলে তুলা চাষের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ হেক্টরে। একই সময়ে তুলার উৎপাদন ১৯ হাজার বেল থেকে বেড়ে ৩১ হাজার ৮২০ বেলে উন্নীত হয়েছে।

যশোরের ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলায় তুলা চাষে ব্যাপক সাফল্য দেখা গেলেও জেলার কোনো উপজেলাতেই এ আবাদ কমেনি। বরং উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তির কারণে তুলা চাষের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে তুলা চাষে বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকসহ প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিঘাপ্রতি গড়ে ১৫ মণ তুলা উৎপাদন হলে বর্তমান বাজারদরে প্রায় ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের নিট লাভ থাকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

তুলা চাষে সময় বেশি লাগলেও ধান, ভুট্টা বা অনেক সবজি ফসলের তুলনায় ঝামেলা কম এবং লাভ ভালো হওয়ায় অনেক কৃষক এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় কৃষক দ্রুত ফলনশীল সবজি চাষের দিকে ঝুঁকলেও তুলার ভালো বাজারদর তাদের আবার এ ফসলে ধরে রাখছে।

তুলা বিক্রির বাজারব্যবস্থা নিয়েও সন্তুষ্ট কৃষকরা। ফসল তোলার পর বিক্রির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। স্থানীয় পর্যায়েই ক্রেতা ও বাজার থাকায় কৃষকরা সহজেই তুলা বিক্রি করতে পারছেন। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য না থাকায় বাজারদরের প্রায় পুরো সুবিধাই কৃষক পাচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি মণ বীজ-তুলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯৪০ টাকায়, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় মণপ্রতি গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি।

তবে তুলা চাষে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনার পরিমাণও চাষির তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি তাদের।

তুলা চাষি বাবলু রহমান ও মানোয়ার হোসেন বলেন, তুলা মাঠে দীর্ঘ সময় থাকলেও লাভ ভালো পাওয়া যায়। তুলা সংগ্রহে আধুনিক বা যান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা গেলে শ্রমিকের পেছনে বাড়তি খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

কৃষক জালাল উদ্দীন ও ফকির আলী বলেন, সারের বাড়তি দাম ও শ্রমিকের মজুরি তুলা চাষে বড় বাধা। সরকার যদি প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বীজ ও সার সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে যশোরে তুলা চাষ আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে।

যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, দেশের উৎপাদিত মোট তুলার প্রায় ৭০ শতাংশই যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় উৎপাদিত হয়। তুলা চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে উন্নত জাতের বীজের কোনো সংকট নেই। তবে কৃষকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, দেশের মোট তুলার চাহিদার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় তুলা উৎপাদন আরও বাড়ানো প্রয়োজন। যশোর অঞ্চলে বর্তমানে তুলা থেকে বীজ ও আঁশ পৃথক করার একটি জিনিং মিল রয়েছে। স্থানীয়ভাবে সুতা তৈরির শিল্প বা স্পিনিং মিল গড়ে উঠলে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকরাও তুলার ন্যায্যমূল্য থেকে আরও বেশি লাভবান হবেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলা চাষের সম্প্রসারণে উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনার আওতা বাড়ানো গেলে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তুলা উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণে স্থানীয় তুলার ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে।