তৃণমূল পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটিয়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশে হাতে নেওয়া হয়েছিল ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্যচাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’। ৩৭৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকার এই মেগা প্রকল্পে কাগজপত্রে সফলতার বড় বড় চিত্র দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক বিশৃঙ্খলার চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি ক্রয় আইন (পিপিআর) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ ও গাড়ি মেরামত খাতে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয় এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। টাইমস টুডের হাতে আসা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি)এর প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাড়ে ৮ কোটি টাকার আপত্তি ঝুলছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে এক্সটার্নাল অডিট কর্তৃপক্ষ মোট ২৭টি আপত্তি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে কিছু প্রাথমিক আপত্তি নিষ্পত্তি হলেও ২০২০-২১ অর্থবছরের বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের আপত্তিগুলো এখনও ঝুলে আছে। এসব আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৫ টাকা।
দেখা গেছে, দরপত্র ছাড়াই বাইসাইকেল ও সরঞ্জাম কেনা প্রকাশ্য ও উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের নিয়ম থাকলেও তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আইন ভেঙে নগদ ভাউচার ও সরাসরি আরএফকিউ পদ্ধতিতে ১ হাজার ৩০০টি বাইসাইকেল এবং জেলেদের বিকল্প আয়বর্ধক উপকরণ কেনা হয়েছে। এতে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৯৩০ টাকার গুরুতর আর্থিক অনিয়মের আপত্তি তুলেছে অডিট টিম। এ ছাড়া পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য কেনা প্যাডেল হুইল অ্যারোটর বিতরণের পক্ষে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রাপ্তিস্বীকার বা গ্রহণপত্র মেলেনি। গ্রহণপত্র ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে।
ডরমিটরি সংস্কারের নামে ভুয়া বিল আইএমইডির সরেজমিন ও নথিপত্র বিশ্লেষণে ভবন ও ডরমিটরি সংস্কার খাতের জালিয়াতিও ধরা পড়েছে। প্রকল্পের অধীনে পুরোনো ট্রেনিং সেন্টার কাম ডরমিটরি মেরামত কাজের ক্ষেত্রে কাজের আগের ও পরের কোনো ছবি বা ভিডিও চিত্র সংরক্ষণ করা হয়নি। আসলেই কোনো কাজ হয়েছে নাকি কেবল ভাউচার দিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে প্রায় ৭৯ লাখ ৭ হাজার ৫৩৮ টাকার অনিয়মিত ব্যয়ের প্রমাণ মিলেছে। একইভাবে ২৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩৩৯ টাকার আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান অনুসরণ করা হয়নি এবং কোনো স্টক রেজিস্টার বা মজুদ এন্ট্রি পাওয়া যায়নি।
তথ্য বলছে, প্রশিক্ষণ ও গাড়ি মেরামতে অতিরিক্ত ব্যয় মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো তহবিল খরচ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ খাতে নির্ধারিত আর্থিক সীমা লঙ্ঘন করে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৬ কোটি ৭৮ লাখ ৩২ হাজার ৪৬৫ টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে গাড়ি মেরামত ও জ্বালানি খাতেও ক্ষমতার অতিরিক্ত ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ঠিকাদারদের বিল থেকে কম হারে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
তথ্য গোপনের অপচেষ্টা আইএমইডির প্রতিবেদনে মূল প্রকল্প প্রস্তাবনা এবং সমাপ্তি প্রতিবেদনের তথ্যে বড় ধরনের গরমিলও ধরা পড়েছে। মূল ডিপিপিতে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রতি হেক্টরে ৫.৩০ মে.টন ধরা হলেও পিসিআরে তা কমিয়ে ৩.৩০ মে.টন দেখানো হয়েছে। একইভাবে তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ ও পাবদা-গুলশার লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে দেখিয়ে প্রকল্পের ব্যর্থতা ও পুকুরচুরি ঢাকার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এই বড় অংকের অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি হয়নি, তবে জবাব প্রেরণ করা হয়েছে।
মৎস্যচাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্পটির বিভিন্ন সফলতা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও তুলে ধরেছে আইএমইডি।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গঠিত কমন বেনিফিশিয়ারি গ্রুপ ও ইউনিয়ন অ্যাকুয়াকালচার ম্যানেজমেন্ট কমিটিগুলোকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে সব মৎস্যচাষিকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য ফলোআপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া হালদা, যমুনা ও পদ্মার মতো প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে মা মাছ ও রেনু-পোনা সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, পলি জমা বা মালিকানা দ্বন্দ্বে পতিত থাকা জলাশয়গুলো সংস্কার করা এবং প্রযুক্তিজ্ঞানে প্রশিক্ষিতদের সেবা নিরবিচ্ছিন্ন রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যৎ প্রকল্পে উৎপাদন তথ্য সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটকে কৌশলগত অংশীদার করা, বেসরকারি হ্যাচারিগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, প্রকল্প কাঠামোতে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ রাখা এবং ঝুলে থাকা অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
অডিটের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাবিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

