মানুষের মৃত্যুর সাথে দুনিয়ার জীবনের আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। তবে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, কিছু নেক কাজের প্রতিদান মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে এমন কল্যাণমূলক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে মানুষ দীর্ঘদিন উপকৃত হয়, তা দাতার জন্য পরকালের পাথেয় হতে পারে। ইসলামি পরিভাষায় এ ধরনের চলমান কল্যাণকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়।
সদকায়ে জারিয়া কী
‘সদকা’ অর্থ দান এবং ‘জারিয়া’ অর্থ প্রবহমান বা চলমান। অর্থাৎ এমন দান বা কল্যাণকর কাজ, যার সুফল দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভোগ করে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এমন কাজ করলে এবং তা থেকে মানুষ উপকৃত হতে থাকলে, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মৃত্যুর পরও এর সওয়াব পেতে পারেন।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ছাড়া সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১)
সাধারণ সদকা ও সদকায়ে জারিয়ার পার্থক্য
সাধারণ সদকা ও সদকায়ে জারিয়া-দুটিই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কাউকে খাবার খাওয়ানো, অসহায় ব্যক্তিকে অর্থ দেওয়া কিংবা বিপদগ্রস্ত কাউকে তাৎক্ষণিক সহায়তা করা সাধারণ সদকার উদাহরণ। এসব কাজেরও অনেক ফজিলত রয়েছে।
অন্যদিকে, এমন কোনো উদ্যোগ যার সুফল দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কাজে লাগে, তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেমন-বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা মানুষের ব্যবহারের জন্য মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করা। এসব কাজ থেকে মানুষ যত দিন উপকৃত হবে, তত দিন দাতার জন্য সওয়াবের আশা করা যায়।
মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়ার ১০টি উপায়
১. মসজিদ নির্মাণে সহায়তা
মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে মানুষকে ইবাদতের সুযোগ করে দেওয়া যায়। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এমন কাজে অংশ নেওয়া সদকায়ে জারিয়ার একটি পরিচিত উদাহরণ।
২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কল্যাণকর কাজ। নলকূপ স্থাপন, পানির ট্যাংক নির্মাণ কিংবা বিশুদ্ধ পানির অন্য কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা করলে বহু মানুষ দীর্ঘদিন উপকৃত হতে পারেন।
৩. উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া
কুরআন-হাদিসের নির্ভরযোগ্য শিক্ষা, দ্বীনি বই, উপকারী পাঠ্যবই কিংবা জ্ঞানচর্চার উপকরণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হলে তা দাতার জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে।
৪. বৃক্ষরোপণ করা
ফলদ ও ছায়াদানকারী গাছ লাগানো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষ ও প্রাণীর উপকারে ভূমিকা রাখে। গাছের ফল, ছায়া কিংবা অন্য কোনো উপকার মানুষ বা প্রাণী ভোগ করলে তা কল্যাণকর কাজ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা
স্কুল, মাদ্রাসা, পাঠাগার কিংবা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে মানুষের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা যায়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হলে সেই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে।
৬. চিকিৎসাসেবায় অবদান রাখা
হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা জনসেবামূলক চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, হুইলচেয়ার বা রোগীদের কাজে লাগে এমন উপকরণ দান করেও মানুষের উপকার করা সম্ভব।
৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের সুবিধার্থে কবরস্থানের জমি দান করা একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে মানুষের একটি মৌলিক প্রয়োজন পূরণে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা করা যায়।
৮. জনসাধারণের চলাচলের পথ তৈরি
মানুষের যাতায়াত সহজ করতে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট কিংবা পথচারীদের বিশ্রামের জায়গা নির্মাণে সহায়তা করা যেতে পারে। এসব স্থাপনা দীর্ঘদিন মানুষের কাজে লাগলে তা কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে।
৯. কৃষি ও পানির প্রয়োজনে খাল খনন
কৃষিকাজে সেচ, পানি নিষ্কাশন কিংবা মানুষের পানির প্রয়োজন মেটাতে উপযোগী খাল খনন ও জলাধার তৈরিতে সহায়তা করা যায়। এসব উদ্যোগ বাস্তবসম্মত ও পরিবেশসম্মত হলে দীর্ঘদিন মানুষের উপকারে আসতে পারে।
১০. রক্তদান ও জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ
রক্তদান একজন অসুস্থ বা দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে। এটি অত্যন্ত মহৎ মানবিক কাজ। তবে রক্তদান নিজে সাধারণত সদকায়ে জারিয়ার প্রচলিত উদাহরণ নয়; এর উপকার ও সওয়াবের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য। অন্যদিকে, নিয়মিত রক্তদাতা তৈরি, রক্তদানের সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা জীবনরক্ষাকারী সেবার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পথ হতে পারে।
সদকা কবুল হওয়ার জন্য যা জরুরি
ইসলামে দানের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। দান হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, লোকদেখানো বা প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়। পাশাপাশি দানের অর্থ হালাল হওয়া, উপকারভোগীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং দানের মাধ্যমে কাউকে অপমান না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সদকায়ে জারিয়ার ক্ষেত্রে কাজটির স্থায়িত্ব ও মানুষের উপকারের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো উদ্যোগের উপকারিতা যত দিন অব্যাহত থাকবে, তত দিন সওয়াব পাওয়ার আশা করা যায়। তবে চূড়ান্ত প্রতিদান আল্লাহর হাতে।
মৃত্যুর পরও কল্যাণের সুযোগ তৈরি করতে বড় অঙ্কের অর্থ থাকা জরুরি নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপকারে আসে এমন কোনো কাজে অংশ নেওয়াও হতে পারে পরকালের জন্য মূল্যবান বিনিয়োগ।


