...|...|...

ধর্ম

কোন পরিস্থিতিতে তওবা কবুল হয় না, কী বলেছে কোরআন ও হাদিস

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:০৪
Shares
কোন পরিস্থিতিতে তওবা কবুল হয় না, কী বলেছে কোরআন ও হাদিস

ছবি: সংগৃহীত

মানুষ যত বড় পাপই করুক না কেন, জীবিত অবস্থায় আন্তরিকভাবে তওবা করে পাপ থেকে ফিরে এলে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশা রয়েছে। তবে কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু সময় ও পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন তওবা আর গ্রহণযোগ্য হয় না। বিশেষ করে মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত, কেয়ামতের বড় নিদর্শন প্রকাশ এবং শিরক বা কুফরের ওপর মৃত্যুবরণের ক্ষেত্রে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

ইসলামি শিক্ষায় তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়; বরং পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তা পরিত্যাগ করা এবং পুনরায় সেই পাপে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করাও এর অংশ। আর কারও অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্তে তওবা

মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছে গেলে সেই মুহূর্তের তওবা আর কবুল হয় না। জীবনের শেষ পর্যায়ে পরিণতি উপলব্ধি করে অনুশোচনা প্রকাশের পরিবর্তে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় পাপ থেকে ফিরে আসার ওপর ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের জন্য কোনো তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তওবা করছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৮)

এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয় বা প্রাণবায়ু কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৩৭)

ফেরাউনের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ডুবে যাওয়ার সময় মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে সে ইমান আনার কথা বলেছিল। কিন্তু তখন তার সেই ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি।

কোরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘যেদিন তোমার রবের কোনো নিদর্শন এসে পড়বে, সেদিন কোনো ব্যক্তির ইমান তার কাজে আসবে না, যদি সে আগে ইমান না এনে থাকে অথবা তার ইমানের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন না করে থাকে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৮)

পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠলে

কেয়ামতের অন্যতম বড় নিদর্শন হলো পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার পর নতুন করে ইমান আনা বা তওবা করার সুযোগ আর আগের মতো থাকবে না।

পবিত্র কোরআনের সুরা আনআমের ১৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশের পর ইমানের উপকার না পাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৩)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তওবার সুযোগ সীমাহীন সময়ের জন্য নয়। তাই জীবিত থাকা অবস্থায় পাপ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে অবহেলা করা উচিত নয়।

মানুষের অধিকার নষ্ট করলে

ইসলামে আল্লাহর হক এবং বান্দার হকউভয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নামাজ-রোজার মতো ইবাদতে অবহেলা কিংবা আল্লাহর অবাধ্যতার মতো পাপের ক্ষেত্রে আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু অন্যের অধিকার নষ্ট করা, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা কিংবা কারও ওপর জুলুম করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে বা কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয়...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

অর্থাৎ, মানুষের প্রতি অন্যায় করে শুধু মৌখিকভাবে তওবা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অন্যের পাওনা বা অধিকার থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

শিরক বা কুফরের ওপর মৃত্যুবরণ করলে

ইসলামে শিরককে সবচেয়ে গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে জীবিত অবস্থায় শিরক থেকে আন্তরিকভাবে তওবা করে ইসলামে ফিরে এলে ক্ষমার সুযোগ রয়েছে। বিপরীতে, কেউ যদি শিরক বা কুফরের ওপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য পরকালে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)

এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো, শিরক থেকে ফিরে আসার সুযোগ জীবিত অবস্থায় রয়েছে। তাই পাপ যত বড়ই হোক, জীবনের অবশিষ্ট সময়কে তওবা ও সংশোধনের কাজে লাগানো জরুরি।

তওবার জন্য দেরি নয়

ইসলামে তওবা মানুষের জন্য আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। তবে তওবার অর্থ কেবল মুখে ক্ষমা প্রার্থনা নয়; বরং পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তা ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার আন্তরিক সংকল্প করা।

মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত কিংবা কেয়ামতের বড় নিদর্শন প্রকাশের অপেক্ষায় না থেকে এখনই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন হওয়াই ইসলামের শিক্ষা। কারণ, সুযোগ থাকতে পাপ থেকে ফিরে আসা এবং নিজের জীবন সংশোধন করাই প্রকৃত তওবার পরিচয়।