...|...|...

অন্যান্য

মুঘল সম্রাজ্ঞী মরিয়ম-উজ-জামানি: যে নারীকে ঘিরে পর্তুগিজদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান সম্রাট জাহাঙ্গীর

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১ নভেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৫১
Shares
মুঘল সম্রাজ্ঞী মরিয়ম-উজ-জামানি: যে নারীকে ঘিরে পর্তুগিজদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান সম্রাট জাহাঙ্গীর

হরখাবাঈ ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের স্ত্রী ও জাহাঙ্গীরের মা। ছবি: সংগৃহীত

সাল ১৬১৩। ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে তখন ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। এমন সময় পর্তুগিজদের হাতে আটক হয় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী এক নারীর মালিকানাধীন বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ। জাহাজটির নাম ‘রহিমি’। এতে ছিলেন শত শত যাত্রী, যাদের অনেকেই হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাত্রা করেছিলেন। জাহাজে ছিল বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্যও।

জাহাজটির মালিক ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের স্ত্রী এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা মরিয়ম-উজ-জামানি। ঘটনাটি শুধু একটি জাহাজ আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর জেরে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এমনকি সমুদ্রবাণিজ্য ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুঘল দরবারের অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় আসে।

কিন্তু কে ছিলেন এই মরিয়ম-উজ-জামানি? কীভাবে একজন রাজপরিবারের নারী হয়ে তিনি সমকালীন ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছিলেন?

রাজপুত রাজকন্যা থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী নারী

মরিয়ম-উজ-জামানি ছিল একটি রাজকীয় উপাধি। ইতিহাসে তিনি আকবরের রাজপুত স্ত্রী এবং জাহাঙ্গীরের মা হিসেবেই বেশি পরিচিত। তার জন্মনাম হিসেবে ‘হরখা বাই’ নামটি বহুল প্রচলিত হলেও এ পরিচয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

১৫৬২ সালে আকবরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। রাজপুত রাজপরিবারের সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই বিয়ের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাদের সন্তান নুরুদ্দিন মুহাম্মদ সেলিম পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে মুঘল সিংহাসনে বসেন।

জাহাঙ্গীরের মা হিসেবে মরিয়ম-উজ-জামানি রাজদরবারে বিশেষ মর্যাদা ও প্রভাব অর্জন করেন। তবে তার পরিচয় শুধু সম্রাটের স্ত্রী কিংবা রাজমাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পত্তির মালিকানা এবং ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

ইতিহাসবিদ রুবি লাল ও ইরা মুখোটি মুঘল নারীদের ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় মরিয়ম-উজ-জামানির বিশেষ অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। তাদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়, মুঘল রাজপরিবারের নারীরা শুধু অন্তঃপুরের জীবনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে এক প্রভাবশালী নারী

মুঘল আমলে ভারত মহাসাগর ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করা হতো। এই বাণিজ্যে মুঘল রাজপরিবারের সদস্যদেরও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছিল।

মরিয়ম-উজ-জামানি ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম ধনী নারী ব্যবসায়ী। গবেষক অ্যালিসন ব্যাংকস ফিন্ডলি তার গবেষণাপত্র ‘দ্য ক্যাপচার অব মরিয়ম-উজ-জামানিস শিপ: মুঘল উইমেন অ্যান্ড ইউরোপিয়ান ট্রেডার্স’-এ এই নারীর সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে সংঘাতের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক এজেন্ট, মধ্যস্থতাকারী ও আর্থিক পরামর্শক নিয়োজিত ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিদেশে পাঠানো হতো। বিনিময়ে আমদানি করা হতো মূল্যবান ধাতু, রত্ন, সুগন্ধি ও বিলাসবহুল সামগ্রী।

নীল, তুলা, রেশম, চামড়া, ধাতু, কার্পেট, মসলা ও অন্যান্য পণ্য ছিল তার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপরীতে সোনা, রুপা, মুক্তা, হাতির দাঁত, অ্যাম্বার, কাচের সামগ্রী এবং বিভিন্ন বিলাসপণ্য ভারতীয় বাজারে আসত।

তার মালিকানায় একাধিক জাহাজ ছিল। তবে সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে ‘রহিমি’ বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিল।

‘রহিমি’: বাণিজ্য ও হজযাত্রার বিশাল জাহাজ

‘রহিমি’ ছিল শুধু একটি বাণিজ্যিক জাহাজ নয়; ধর্মীয় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতের সুরাট বন্দর থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে জাহাজটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথের কাছাকাছি ইয়েমেনের মোখা বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করত। সেখান থেকে স্থলপথে মক্কায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল।

ইউরোপীয়দের কাছে জাহাজটি ‘দ্য গ্রেট পিলগ্রিম শিপ’ নামেও পরিচিত ছিল। কারণ, এতে বিপুলসংখ্যক হজযাত্রী যাতায়াত করতেন।

জাহাজটির ধারণক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় বড় অঙ্কের সংখ্যা পাওয়া যায়। কোথাও একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী বহনের সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এতে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব ছিল।

জাহাজটির মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পৌঁছাত। অন্যদিকে আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পণ্যও ভারতে নিয়ে আসা হতো। ফলে ‘রহিমি’ ধর্মীয় যাতায়াতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে মরিয়ম-উজ-জামানির সংঘাত

ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে তখন পর্তুগিজদের শক্তিশালী অবস্থান ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে তারা ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এ উদ্দেশ্যে তারা ‘কার্তাজ’ নামে নৌ-অনুমতিপত্র ব্যবস্থা চালু করেছিল। ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে পর্তুগিজদের কাছ থেকে এই অনুমতিপত্র নিতে হতো। অনুমতি ছাড়া চলাচল করলে জাহাজ আটক বা আক্রমণের ঝুঁকি থাকত।

মুঘল সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী স্থলভিত্তিক সাম্রাজ্যের জন্যও সমুদ্রপথে পর্তুগিজদের এই আধিপত্য ছিল একটি বড় সমস্যা।

ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ফস্টারের সংকলিত ঐতিহাসিক নথিতে মরিয়ম-উজ-জামানির জাহাজকে ঘিরে পর্তুগিজদের সঙ্গে বিরোধের আগের কয়েকটি ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।

১৬০৯ সালের দিকে তার একটি জাহাজ মোখার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে সময় পর্তুগিজরা মোটা অঙ্কের অর্থ না দিলে জাহাজটি গুজরাটের দিউ বন্দরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং তুলনামূলক কম অর্থের বিনিময়ে জাহাজটির যাত্রার সুযোগ তৈরি হয়।

এরপর ১৬১০-১১ সালের দিকে আরেকটি বাণিজ্যিক ঘটনায় ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। আগ্রার কাছাকাছি একটি নীল উৎপাদনকেন্দ্র থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য মরিয়ম-উজ-জামানির একজন প্রতিনিধি কাজ করছিলেন। কিন্তু ইংরেজ বণিক উইলিয়াম ফিঞ্চ বেশি দাম দিয়ে সেই পণ্য কিনে নেন।

ঘটনাটি মরিয়ম-উজ-জামানিকে ক্ষুব্ধ করে। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর প্রভাব পড়ে মুঘল দরবারে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবস্থানের ওপরও।

এই ঘটনাগুলো দেখায়, মরিয়ম-উজ-জামানি শুধু রাজকীয় সম্পদের মালিক ছিলেন না; নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় তিনি সরাসরি দরবারের ক্ষমতাও কাজে লাগাতেন।

১৬১৩: পর্তুগিজদের হাতে ‘রহিমি’ আটক

মরিয়ম-উজ-জামানির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত বাণিজ্যিক বিপর্যয় ঘটে ১৬১৩ সালে। সে সময় পর্তুগিজরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথের কাছে তার মালিকানাধীন ‘রহিমি’ জাহাজ আটক করে গোয়ায় নিয়ে যায়।

জাহাজটিতে কয়েকশ যাত্রী ছিলেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৭০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হজযাত্রীও ছিলেন। জাহাজে থাকা মূল্যবান বাণিজ্যিক পণ্যও পর্তুগিজরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাহাজটির পর্তুগিজ অনুমতিপত্র ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। তারপরও জাহাজটি আটক করা হয়। ফলে ঘটনাটি শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মুঘল রাজপরিবারের মর্যাদার ওপরও আঘাত হিসেবে দেখা হয়।

সম্রাট জাহাঙ্গীর বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তার মায়ের মালিকানাধীন জাহাজ আটক হওয়ার ঘটনা মুঘল দরবারকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

মুঘল সম্রাটের পাল্টা পদক্ষেপ

‘রহিমি’ আটক হওয়ার পর জাহাঙ্গীর পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। ঐতিহাসিক ফিন্ডলির বিবরণ অনুযায়ী, তিনি সুরাট বন্দর থেকে নৌ চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণাধীন দিউ ও দামান অঞ্চলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

মুঘলদের এই প্রতিক্রিয়া পর্তুগিজদের জন্য বড় চাপ তৈরি করে। কারণ, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ছিল তাদের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্তুগিজরা মুঘল দরবারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করে। ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমের সংকলিত বিবরণে জাহাজের ক্ষতিপূরণ এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী ভারতীয় জাহাজগুলোর জন্য অতিরিক্ত অনুমতির বিষয়ে সমঝোতার কথা পাওয়া যায়।

উইলিয়াম ফস্টারের সংকলিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিতে জাহাজটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিন লাখ টাকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে পর্তুগিজদের সঙ্গে সমঝোতার অন্যতম শর্ত ছিল ভারতে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক উপস্থিতি সীমিত করা বা তাদের বহিষ্কার করা। জাহাঙ্গীর এই শর্ত মেনে নেননি।

কারণ, তত দিনে তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে পর্তুগিজদের একচ্ছত্র আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি ব্রিটিশদেরও রয়েছে।

এই সংঘাতের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় বণিকদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পায়। পর্তুগিজদের সঙ্গে মুঘলদের সম্পর্কের অবনতি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল।

রাজমাতার সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব

মরিয়ম-উজ-জামানির প্রভাব শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুঘল রাজদরবারে তার মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উঁচু।

ঐতিহাসিক উইলিয়াম ফস্টারের সংকলিত বিবরণে রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ চার ব্যক্তির মধ্যে তার নাম পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকের ১২ হাজার অশ্বারোহী রাখার অধিকার ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। এই তালিকায় সম্রাট নিজেও ছিলেন এবং মরিয়ম-উজ-জামানি ছিলেন একমাত্র নারী।

নওরোজ উৎসবের সময় রাজদরবারের অভিজাত ব্যক্তিরা পদমর্যাদা অনুযায়ী তাকে মূল্যবান উপহার দিতেন। তার নামে সরকারি ফরমান জারির ক্ষমতা থাকার কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য ছিল। বাগান, কূপ, মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে তিনি অর্থ ব্যয় করেন।

লাহোরে অবস্থিত বেগম শাহী মসজিদ, যা মরিয়ম-উজ-জামানির মসজিদ নামেও পরিচিত, তার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। এটি মুঘল স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পুরোনো লাহোরের মস্তি গেটের কাছে অবস্থিত মসজিদটি আকবরি গেট ও লাহোর দুর্গের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত।

১৬২৩ সালে মরিয়ম-উজ-জামানির মৃত্যু হয়। তবে তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও প্রভাবের উত্তরাধিকার মুঘল রাজপরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের মধ্যেও দেখা যায়।

মরিয়ম-উজ-জামানির পর মুঘল নারীদের বাণিজ্য

মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সময়ে নূরজাহান ও জাহানারা বেগমের মতো নারীরাও ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নূরজাহান ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী। অন্যদিকে জাহানারা ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের কন্যা। তাদের সম্পদ ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়।

তবে মরিয়ম-উজ-জামানির বিশেষত্ব ছিল তার সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে সরাসরি অংশগ্রহণ। তিনি নিজের জাহাজ পরিচালনা করতেন, বিদেশি বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা করতেন এবং প্রয়োজনে রাজদরবারের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতেন।

‘রহিমি’ হারানোর পরও তার সামুদ্রিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তার অন্যান্য জাহাজের মাধ্যমে বাণিজ্য ও হজযাত্রী পরিবহন অব্যাহত ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

মুঘল আমলে নারীদের অর্থনৈতিক ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় মরিয়ম-উজ-জামানি তাই বিশেষভাবে আলোচিত।

রহিমির পর গঞ্জ-ই সাওয়াই: সমুদ্রের আরেক ঐতিহাসিক জাহাজ

মরিয়ম-উজ-জামানির ‘রহিমি’ আটকের ঘটনা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে আরেকটি মুঘল জাহাজ বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। সেটি হলো ‘গঞ্জ-ই সাওয়াই’।

১৬৯৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ইংরেজ জলদস্যু হেনরি অ্যাভেরি মোখা থেকে সুরাটের পথে থাকা এই বিশাল মুঘল জাহাজটি আটক করেন। ঘটনাটি ঘটে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে। জাহাজটিতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও যাত্রী ছিলেন।

গঞ্জ-ই সাওয়াই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ। এতে কামানসহ শক্তিশালী সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল। তবে জলদস্যুদের আক্রমণে জাহাজটি পরাজিত হয়। এ ঘটনা মুঘল সাম্রাজ্য ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পর্কেও বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

এখানে একটি ঐতিহাসিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: ‘গঞ্জ-ই সাওয়াই’ মরিয়ম-উজ-জামানির তৈরি বা তার মালিকানাধীন জাহাজ ছিল- এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এটি তার সময়ের কয়েক দশক পর আওরঙ্গজেবের আমলের একটি পৃথক ঘটনা।

ইতিহাসে মরিয়ম-উজ-জামানির অবস্থান

মরিয়ম-উজ-জামানির জীবন মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যখন সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল।

তার হাতে ছিল সম্পদ, জাহাজ, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এবং রাজদরবারের প্রভাব। আবার সেই ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় নৌ-শক্তির আধিপত্যের কারণে তার জাহাজ আটক হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।

‘রহিমি’ হারানোর ঘটনা প্রমাণ করে, মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিপুল ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী একজন নারীও আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রতিকূলতা থেকে মুক্ত ছিলেন না।

তবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়তো শুধু বিপুল সম্পদ কিংবা জাহাজের বহর নয়। বরং পুরুষপ্রধান একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও তিনি যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন, সেটিই তাকে ইতিহাসের পাতায় আলাদা করে রেখেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।