...|...|...

অন্যান্য

বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় রাজধানীর নামী-দামি শপিংমল

টাইমস টুুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১:২৫
Shares
বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় রাজধানীর নামী-দামি শপিংমল

ছবি: সংগৃহীত

একসময় রাজধানী ঢাকার শপিংমলগুলোর ঝলমলে আলো ও ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকত। আজ সেখানে বিরাজ করছে এক ধরনের স্থবিরতা ও হাতাশার চিত্র। 
রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার, অর্কিড পয়েন্ট কিংবা সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির মতো বিপণিবিতানগুলো আজ গভীর সংকটে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকান খুলে বসে থেকেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অনেক দোকানে দুপুর গড়িয়ে গেলেও হয় না দিনের প্রথম বিক্রি। 
এই দীর্ঘমেয়াদি মন্দা কেবল ব্যবসায়ীদের পুঁজিই খাচ্ছে না, বরং তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর মানবিক ও আর্থিক সংকটের মুখে।
এমন পরিস্থিতি নিশ্চয়ই একদিনে আসেনি।  এর পেছনে রয়েছে বহুবিধ কারণ। এইসব বিষয় নিয়ে তৈরি করা হয়েছে আজকের প্রতিবেদন।

​বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর প্রথাগত শপিংমলগুলোতে এই ধসের পেছনে কোনো একটিমাত্র কারণ দায়ী নয়; বরং বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল এটি। প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​অনলাইন কমার্সের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা: ঘরে বসেই পছন্দের পণ্য দোরগোড়ায় পাওয়ার সুবিধা এবং সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ফেইসবুক পেজ ও ই-কমার্স সাইটগুলোর শপিং ট্রেন্ড ক্রেতাদের একটি বড় অংশকে শপিংমল বিমুখ করেছে। অনলাইন শপগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় বড় শোরুম ভাড়া বা অতিরিক্ত স্টাফ খরচ না থাকায় তারা তুলনামূলক কম লাভে পণ্য বিক্রি করতে পারে।

​ফুটপাত ও হকারদের সাশ্রয়ী বাজার: রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন ফুটপাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রেন্ডি পোশাক ও প্রসাধনসামগ্রী পাওয়ায় সীমিত ও মধ্যবিত্ত আয়ের ক্রেতারা ঐতিহ্যবাহী শপিংমলের চেয়ে ফুটপাতের দিকে ঝুঁকছেন।

​সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি: দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাসাভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং খাদ্যপণ্য ক্রয়ের মতো মৌলিক খাতে। ফলে পোশাক বা শৌখিন পণ্য কেনার মতো 'বিলাসী' বা অতিরিক্ত খরচ অনেকে কমিয়ে দিয়েছেন।

​উচ্চ অপারেশনাল খরচ (দোকানভাড়া ও সার্ভিস চার্জ): অভিজাত মলগুলোতে চড়া দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, জেনারেটর খরচ এবং কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বিক্রির খরা চললেও এই নির্দিষ্ট খরচগুলোর ছাড় মেলে না, যা ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে দিচ্ছে।

​কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পতন (একটি সতর্কবার্তা): ১৯৯৮ সালে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে চালু হওয়া ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স দীর্ঘদিনের লোকসান, ক্রেতাসংকট ও বকেয়া বিলের চাপ সইতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি অন্যান্য মলের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় অ্যালার্মিং সংকেত বা সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।
​ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ও মানবিক সংকট: ​এই মন্দার কারণে ব্যবসায়ীরা শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখেই নেই, তাদের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে:
​ঋণের পাহাড় ও মূলধন ক্ষয়: বছরের পর বছর ধরে চলা লোকসান সামলাতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক, আত্মীয়স্বজন বা মহাজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। দোকানে ১৫-২০ লাখ টাকার পণ্য থাকলেও নগদ অর্থের অভাবে তারা সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না।
​পরিবার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম: ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পুরো পরিবার এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দোকান থেকে আয় বন্ধ থাকায় বাসাভাড়া দেওয়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা এবং পরিবারের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
​কর্মসংস্থানের সংকোচন: অনেক দোকান মালিক বাধ্য হয়ে কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা দোকান চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন। এর ফলে হাজার হাজার বিক্রয়কর্মী ও কর্মচারীর জীবনও আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
​এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রতিকার ও করণীয়: ​এই ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক খাত ও এর সাথে জড়িত লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

​ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ যৌক্তিকীকরণ: মার্কেট কর্তৃপক্ষ ও দোকান মালিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে বর্তমান মন্দা পরিস্থিতি বিবেচনা করে দোকানভাড়া, এসি ও জেনারেটর চার্জ এবং অন্যান্য সার্ভিস চার্জ উল্লেখযোগ্যহারে কমানো বা পুনর্বিন্যাস করা উচিত।

​ডিজিটাল রূপান্তর (ওমনিচ্যানেল স্ট্র্যাটেজি): সনাতন ব্যবসার ধারণ থেকে বের হয়ে প্রথাগত ব্যবসায়ীদেরও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। শপিংমলের দোকানগুলোর যৌথ অনলাইন পেজ বা অ্যাপ চালু করে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিতে হবে।

​মলের আকর্ষণ বৃদ্ধি ও বহুমুখী সুযোগ-সুবিধা: শুধু কেনাকাটা নয়, শপিংমলগুলোতে ফুডকোর্ট, ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট জোন বা আকর্ষণীয় ইভেন্টের ব্যবস্থা করে ক্রেতাদের পুনরায় মমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

​সহজ শর্তে প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বা প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে, যেন তারা অন্তত এই ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠতে পারেন।

​ভোক্তা আস্থা ফেরাতে বিশেষ ছাড় ও উৎসব আয়োজন: বিভিন্ন বিশেষ উৎসব বা মৌসুমে যৌথ প্রচারণার মাধ্যমে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট অফার দিয়ে ক্রেতাদের আবার শপিংমলে ফিরিয়ে আনার কৌশলগত মার্কেটিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোর এই ধস কেবল কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পতন নয়; এটি মধ্যবিত্ত অর্থনীতির সংকোচন এবং খুচরা বাণিজ্য খাতের একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। সময়মতো সঠিক নীতিগত সহায়তা, খরচ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ এবং ব্যবসায়ীদের আধুনিক মানসিকতার সমন্বয় না ঘটলে এককালের প্রাণোচ্ছল এই বিপণিবিতানগুলো ইতিহাস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।