...|...|...

বিশ্ব

ছবি দিয়ে স্কুলছাত্রীদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিক্ষকের কারাদণ্ড

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:৩২
Shares
ছবি দিয়ে স্কুলছাত্রীদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিক্ষকের কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টার এলাকায় ক্লাসরুমসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রীদের গোপনে আপত্তিকর ছবি তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের ছবি দিয়ে ফেক পর্নোগ্রাফি তৈরির দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আবুসালি রহমান (৩৭) নামের এক খণ্ডকালীন শিক্ষকের ৬ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।

বিবিসি বলছে, সম্প্রতি বোল্টন ক্রাউন কোর্টে ২১টি অপরাধের অভিযোগ স্বীকার করার পর আদালত তাকে এই সাজা দেন। পাশাপাশি তাকে যৌন অপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং আগামী ২০ বছর স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ‘যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ আদেশ’ জারি করা হয়েছে।

যেভাবে অপরাধের শিকার হয় ছাত্রীরা

মামলার বিবরণে জানা যায়, ম্যাঞ্চেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করা আবুসালি রহমান উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মোট ২৫টি স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। বোল্টন, বুরি এবং স্যালফোর্ড এলাকার ৭টি মাধ্যমিক স্কুলের ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সি অন্তত ১৫ জন ছাত্রীকে তিনি টার্গেট করেছিলেন। পুলিশ এর মধ্যে ১২ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করেছে।

আবুসালি রহমান শিক্ষকতার সুযোগ নিয়ে তার শার্টের ওপরের পকেটে আইফোন লুকিয়ে রেখে ক্লাসরুমে পাঠদানের সময় ছাত্রীদের গোপনে ছবি তুলতেন। এমনকি স্কুল ভবনের সিঁড়িতে ছাত্রীদের পেছনে হেঁটে গিয়েও তিনি আপত্তিকর ছবি তুলতেন।

তার কুকীর্তি ধরা পড়ে যখন

এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর মা সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ স্ক্রোল করার সময় স্কুল ইউনিফর্ম পরা মেয়ের ছবির ঠিক পাশেই গ্রাফিক ও যৌন উত্তেজক ছবি দেখতে পান। পরবর্তীতে পুলিশি তদন্তে জানা যায়, রহমানের একটি ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টে প্রায় ১ হাজার ফলোয়ার ছিল, যেখানে তিনি এসব কনটেন্ট পোস্ট করতেন।

তদন্ত ও প্রমাণের চাঞ্চল্যকর তথ্য

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ছাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল খুঁজে বের করতেন রহমান। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ছবিগুলোকে বিকৃত ও যৌনতাপূর্ণ রূপ দিতেন তিনি।

অভিযুক্ত শিক্ষকের ফোন তল্লাশি করে পুলিশ ছাত্রীদের নাম ও ঠিকানাসংবলিত ইলেকট্রনিক ফাইল উদ্ধার করে, যা দিয়ে তিনি অনলাইনে ছাত্রীদের ছবি খুঁজে বের করতেন। এছাড়া ধরা না পড়ে কীভাবে ছবি তোলা যায় এবং কোথায় স্পাই ক্যামেরা পাওয়া যাবে—সে বিষয়েও তিনি ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করেছিলেন।

পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা ডিসি লিসা ম্যাকগাফিন জানান, অপরাধীরা দ্রুত বিকাশমান এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে পুলিশ এ ধরনের অপরাধ দমনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। প্রসিকিউটর টম ফার আদালতের কাছে জানান, তল্লাশিতে ২২৬টি ক্যাটেগরি ‘সি’ ছবিসহ বিভিন্ন শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ক্লাসরুম ও করিডোরে তোলা আপত্তিকর ছবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আসামিপক্ষের আইনজীবী এমা কেহো জানান, প্রসিকিউশনের মূল অভিযোগ এমন ছিল না যে রহমান নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় এসেছিলেন। তবে তিনি বলেন, সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল এবং থামতে পারছিল না।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

এই মর্মান্তিক ঘটনায় ছাত্রীরা গভীরভাবে মানসিক আঘাত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। জিসিএসই পরীক্ষা চলার কারণে পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের অভিভাবকরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিষয়টি কিশোরীদের জানিয়েছেন।

মামলার রায়ের পর সিনিয়র ক্রাউন প্রসিকিউটর আলেকজান্ডরা মান এটিকে ‘বিশ্বাসের এক চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, যেখানে শিশুরা নিরাপদ বোধ করার কথা, সেই স্কুলের পরিবেশে শিক্ষকতার অবস্থানকে অপব্যবহার করে শিশুদের অজান্তেই তাদের ছবি ধারণ করেছে রহমান।

শিশু অধিকার সংস্থা এনএসপিসিসি এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এআই-এর মাধ্যমে শিশুদের যৌনতাপূর্ণ ডিপফেক ছবি তৈরি ও প্রচার রোধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও ব্রিটিশ মিডিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফকম’-এর পক্ষ থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

অফকমের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট অনুযায়ী অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি চলছে এবং এ ধরনের অপরাধ রোধে ব্যর্থ হওয়ায় এর আগে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে কোটি কোটি পাউন্ড জরিমানা ও তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে।