...|...|...

রাজধানী

মামলা করলে আদালতে দৌড়াদৌড়ি, ভোগান্তি: তাহসিফের বাবা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮:৪৮
Shares
মামলা করলে আদালতে দৌড়াদৌড়ি, ভোগান্তি: তাহসিফের বাবা

একেএম এনায়েতুল করিম ও নিহত কেএম তাহসিফ সাউরি। ছবি: সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় আপাতত মামলা করার কথা ভাবছে না তার পরিবার। মামলা করলে আদালতে দৌড়াদৌড়িসহ নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন তার বাবা একেএম এনায়েতুল করিম। তবে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তিনি।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে একেএম এনায়েতুল করিম জানান, মামলা করার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার বিশ্বাস, সরকার নিজ উদ্যোগেই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

পুলিশের ধাওয়ায় তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে তার সাথে থাকা বন্ধু দীপের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাহসিফের বাবা। তিনি বলেন, ‘একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়াতে দৌড় দেবে, এটা হাস্যকর বক্তব্য না? এটা তো প্রশ্নই আসে না।’

মামলা করার বিষয়ে তাহসিফ সাউরির বাবা বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনো ভাবিনি। আমরা পারিবারিকভাবে এটা আলোচনা করব, পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

মামলা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘মামলা মানেই তো আমাদের দেশে একটা ঝামেলা। কোর্টে দৌড়াদৌড়ি, কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।’

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ঘটনার রাতের বিষয়ে দীপ বিভিন্ন তথ্য দিলেও সেগুলোর সবকিছু বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তাই তার দেওয়া প্রতিটি তথ্য যাচাই করে দেখছেন তারা।

শুক্রবার গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘ছায়াতদন্তের একটা পর্যায়ে আমরা জানতে পেরেছি, সাউরি যেদিন রাতে নিখোঁজ হন, সেদিন তার সঙ্গে একজন বন্ধু ছিলেন। তার নাম দীপ। তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। দীপ নানা তথ্য দিয়েছেন। আসলে সেই তথ্যগুলোর সব আমরা বিশ্বাসও করি না। প্রতিটি বিষয় আমরা যাচাই করে দেখছি।’

তাহসিফের সাথে দীপের পরিচয় ও সম্পর্কের বিষয়ে তার বাবা জানান, তাহসিফ অন্য চাকরি করার পাশাপাশি একটি ছোট ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দীপ সেই ব্যবসাটি দেখাশোনা করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজ করতেন তারা। দীর্ঘদিন ধরেই দীপের সাথে তাহসিফের পরিচয় ছিল। মাঝেমধ্যে তিনি তাদের বাসায় যাতায়াতও করতেন।

এ বিষয়ে এনায়েতুল করিম বলেন, ‘যেহেতু সে অন্য চাকরি করত, আমার ছেলে, এজন্য তার ছোট ব্যবসাটা দীপ দেখাশোনা করত পড়াশোনার পাশাপাশি। এভাবেও একটা সম্পর্ক তার সঙ্গে ছিল বলে আমার জানা। বিভিন্ন কোম্পানিতে সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহ করা। অনেক দিন ধরে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায় আসত, খাওয়া-দাওয়া করত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি তার বাবা-মা ও ছোট ভাইও একবার আমাদের বাসায় এসেছিলেন, দুপুরের খাবার খেয়ে গেছেন।’

নিখোঁজ হওয়ার আগে মাকে শেষ বার্তা

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনা তুলে ধরে তার বাবা জানান, বাসায় ফেরার কথা জানিয়ে মাকে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সারা রাত ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন তার মা। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাননি।

এনায়েতুল করিম বলেন, ‘রাতে শেষ মেসেজ দিয়েছিল ওর মাকে যে সে এখনই ফিরছে, রওনা হয়েছে। এরকম একটা ছোট মেসেজ দিয়েছিল। কিন্তু এরপরে তাকে আর মোবাইলে পাওয়া যায়নি। ওর মা সারা রাত বসে অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু ছেলে আর ফেরেনি। তার মা কিছুক্ষণ পরপর যোগাযোগের চেষ্টা করছিল।’

ছেলের লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে উঠে যখন দেখি ছেলে আসেনি, তখন আমিও চেষ্টা করেছি, ফোন বন্ধ পেয়েছি। তারপরে দুপুরে আমি তুরাগ থানায় গিয়েছি খবর নিতে। উত্তরখান থানা থেকে সন্ধ্যার একটু আগে আমাকে ফোন করে আমার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে, আমার ছেলের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে জানাল যে তার মরদেহ পাওয়া গেছে রাজাবাড়ী ঘাটে।’

তাহসিফ আত্মহত্যা করতে পারেন, এমন সম্ভাবনা নাকচ করে তার বাবা বলেন, ‘সে তো একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। এজন্য আত্মহত্যার কোনো প্রশ্নই আসে না। ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। সাধারণত সে বের হলে তার বন্ধুদের সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় যেত বলে আমি জানি। আমরা চাই, একজন সুনাগরিক হিসেবে সে দেশের জন্য একটা সম্পদ। কারণ, সে একজন পাইলট।’

ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘সরকার নিশ্চয়ই অত্যন্ত আন্তরিক হবে, অত্যন্ত দায়িত্ববান হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে, তথ্য উদঘাটন করতে এবং এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই আমাদের সরকার অত্যন্ত আন্তরিক পদক্ষেপ নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার রাতে কী ঘটেছিল

পিবিআইয়ের তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার রাতে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। দীপের দাবি, সেখানে পুলিশের ধাওয়ার মুখে পড়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তবে পুলিশের ধাওয়ার ঘটনা কিংবা নদে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।

পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওই এলাকায় অবস্থানকালে পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া করে। তখন দীপ তুরাগ নদীর তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে আত্মগোপন করেন। অন্যদিকে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন বলে দীপ দাবি করেছেন। পরে সেখান থেকে চলে গিয়ে রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন তিনি।

ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপের চলাচলের স্থান এবং তাদের দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘এই এলাকায় তারা এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন। কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, বলেছেন। বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো আমরা সব বিশ্বাস করছি না, যাচাই করছি। তদন্তের স্বার্থে যেগুলো দরকার হবে, সেগুলো আমরা রাখব। যদি মনে হয় এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলো আমরা সেভাবে যাচাই করে দেখব।’

পুলিশের ধাওয়ার বিষয়ে দীপের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ও বলেছে, এখান থেকে দুজন পুলিশ অফিসারকে দেখে ওরা দৌড় দিয়েছে। এখন তারা কারা, সেটা আমরা যাচাই করে দেখব। আদৌ পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কোনো পুলিশ ছিল কি না বা কারও দায়িত্ব ছিল কি না, এই বিষয়গুলো আমরা যাচাই করে দেখব।’

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ওই দিন গভীর রাতে মাকে বার্তা পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানান তিনি। তবে এরপর আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।