শীতের শুরুতেই ভয়াবহ বায়ুদূষণের আশঙ্কায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে রবিবার (১ নভেম্বর) থেকে গাড়ির পার্কিং ফি দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন বিধিনিষেধ অনুযায়ী, নির্ধারিত নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না-এমন যানবাহন দিল্লিতে প্রবেশ করতে পারবে না। ধুলাবালি ছড়ায়, এমন সব ধরনের ভবন ভাঙার কাজ এবং খোলা জায়গায় নির্মাণকাজও তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির শীতকালীন কর্মপরিকল্পনা কার্যকর হয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো এবং ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা সব দিল্লিবাসীকে নির্দেশিকা মেনে চলার এবং দিল্লির বাতাসকে আরও পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর করে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এর আগে গত এক মাস ধরেই দূষণ কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে দিল্লি সরকার। এর মধ্যে রয়েছে খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ এবং কয়লা ও কাঠ ব্যবহার করে খাবার তৈরি করা স্টলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ।
তবে প্রতিবছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লিতে ভয়াবহ স্মগ বা ধোঁয়াশা তৈরি হয়। আগের বছরগুলোতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও দূষণ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি। শীতকালে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় দূষিত কণাগুলো ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আটকে থাকে। ফলে বাতাসের মান দ্রুত অবনতি হয়।
দিল্লির বায়ুদূষণের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যানবাহনের ধোঁয়া, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো অন্যতম।
ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শীতকালে দিল্লির দূষণের প্রায় ২৩ শতাংশ আসে যানবাহন থেকে। আর খড়কুটোসহ বিভিন্ন জৈবপদার্থ পোড়ানোর কারণে তৈরি হয় প্রায় ২০ শতাংশ দূষণ। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য শিল্পকারখানার অবদান প্রায় ৯ শতাংশ।
দূষণের অন্যতম বিপজ্জনক উপাদান পিএম ২.৫। অতি সূক্ষ্ম এই কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করার পাশাপাশি রক্তপ্রবাহেও মিশতে পারে। ক্যানসারের ঝুঁকিসহ নানা গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। শীতের প্রথম দিকে দিল্লিতে পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব প্রায়ই প্রতি ঘনমিটারে ৩০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে যায়। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ করা দৈনিক সীমার প্রায় ২০ গুণ।
গত বছর দিল্লিতে পিএম ২.৫-এর মাত্রা সর্বোচ্চ প্রতি ঘনমিটারে ৮৪৬ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছেছিল। যা ডব্লিউএইচওর মানদণ্ডের তুলনায় ৫৬ গুণ বেশি। চলতি বছরের ১ নভেম্বর বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের হিসাবে এই দূষণের মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ২০১ মাইক্রোগ্রাম। নিরাপদ সীমার তুলনায় যা ১৩ গুণেরও বেশি। তবে গত কয়েক দিনের বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ’-এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতে বায়ুদূষণের সাথে সম্পর্কিত কারণে আনুমানিক ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।


