চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার শিশু মো. রায়হানের একটি পা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর একটি চক্র কেটে দিয়েছে- সম্প্রতি এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের অনুসন্ধানে এ অভিযোগের সাথে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি।
পুলিশের অনুসন্ধান, রায়হান ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তেই তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। একইসাথে তার কিডনি অপসারণের অভিযোগেরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, রায়হানের দুই কিডনিই স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।
রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। ১২ বছর বয়সী এই শিশু একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। প্রায় সাত-আট মাস আগে পারিবারিক অভিমানের কারণে নিজ বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসে সে। পরে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান শুরু করে। সেখানে শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় এলইইডিও পরিচালিত পথশিশু স্কুলে নিয়মিত পড়াশোনা করত এবং দুপুরের খাবার খেত।
ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত
গত ১১ জুন ঢাকা থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় রায়হান। এতে তার ডান পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে।
দুর্ঘটনার পর ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের টহল দল তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনা করে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
বিষয়টি জানতে পেরে বিমানবন্দর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নির্দেশনায় রেলওয়ে পুলিশের সদস্য কনস্টেবল/৭৭২ রিয়াজুল করিম হাসপাতালে উপস্থিত হন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে রায়হানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ পাঠান। ওই দিন ১১ জুন ২০২৬ বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে নিটোরের এক্সট্রা-১৩ নম্বর বেডে তাকে ভর্তি করা হয়।
নিটোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই রায়হানের ডান পা কেটে ফেলা হয়। চিকিৎসা শেষে সে আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় অবস্থান করতে থাকে বলে জানা গেছে।
ভিক্ষাবৃত্তিতে নামাতে পা কাটার তথ্য মেলেনি
রায়হানের পা কেটে তাকে জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়েছে- এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, রায়হান ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং নথিপত্রে দেখা যায়, ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার ডান পা কর্তন করা হয়।
রায়হানের কিডনি অপসারণ করা হয়েছে- এমন অভিযোগেরও কোনো প্রমাণ মেলেনি। এ বিষয়ে তার আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, তার উভয় কিডনি বিদ্যমান এবং স্বাভাবিক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চিকিৎসার সময়ও ছিল পরিচর্যার ব্যবস্থা
দুর্ঘটনার পর রায়হানকে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার পরিচর্যার জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে একজন আয়াকেও প্রায় দেড় মাস দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে পাওয়া চিকিৎসা নথিতেও রায়হানের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে নিটোরে চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তেই তার পা কর্তন করা হয়।
পরিবারের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ
চিকিৎসা শেষে আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান করছিল রায়হান। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জরিনা ‘মালির মা’ নামের এক নারীর টিনের ঘরে সে খাবার খেত। সেখানে একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে টাকা জমা রাখত বলেও জানা গেছে। প্ল্যাটফর্মের পানির লাইনে কর্মরত আলামিন ও ইয়াসিন এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পা কর্তনের আগে রায়হান মিনা ও রাজু নামের এক ভিডিও ধারণকারী দম্পতির কাছে অবস্থান করত। পরে ১২ সেপ্টেম্বর জাকির নামের এক ব্যক্তি তাকে পরিবারের কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি বাসে তুলে দেন বলে জানা গেছে।
রায়হানকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। একইসাথে শিশুটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
ভিডিওতেও দুর্ঘটনার কথা বলেছিল রায়হান
ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রায়হানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে হাসপাতালের মেঝেতে বসে তাকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। সে সময় রায়হান আরও জানায়, তার মা-বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়।
পরে ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতি এলাকার একটি মাহফিলে স্থানীয় বাসিন্দারা রায়হানকে দেখতে পান। খবর দেওয়া হলে সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন তার বাবা।
রায়হানের বাবা পেশায় দিনমজুর। তার মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে এবং বর্তমানে তারা আলাদা সংসারে থাকেন। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে রায়হান সৎমায়ের সাথে থাকত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তখনও তার ডান পা ছিল না এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন ছিল।
এসব দৃশ্যের পরই ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার জন্য রাজধানীর কোনো একটি চক্র রায়হানের পা কেটে দিয়েছে- এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের অনুসন্ধান ও চিকিৎসা নথিপত্রে পাওয়া তথ্য সেই দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ বিষয়ে রায়হান ও তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। তারা বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছেন বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে।




